রবিবার | অক্টোবর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের উদ্বোধন 

কুষ্টিয়ায় একদিন ‘লালন নগরী’ হবে- নিতাই রায় চৌধুরী 

ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের উদ্বোধন 

শরিফ মাহমুদ, কুষ্টিয়া : ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’-এই আধ্যাত্মিক মানবতাবাদী প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেল ৪ টার দিকে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়াবাড়িতে বাউল সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রধান অতিথি, নিতাই রায় চৌধুরী ।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, কুষ্টিয়া একদিন ‘লালন নগরী’ হবে। এখানে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে। গড়াই-মধুমতী নদীতে আবার নৌকা চলবে। সরকার সেই লক্ষ্যে কাজ করছে।

​অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রাবন্ধিক প্রফেসর ড. রশিদুল নবী।

​বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত মহিলা আসন-৩০৬-এর সংসদ সদস্য মোসা. ফরিদা ইয়াসমিন, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম এবং কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট লালন সাধক হৃদয় শাহ ও মিজ্ আসমা খানম।

​সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতায় ও কুষ্টিয়া লালন একাডেমির আয়োজনে তিন দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানমালা চলবে আগামী সোমবার (১৯ অক্টোবর) পর্যন্ত। দিবসটি ঘিরে সাঁইজির বারাম খানার আখড়াবাড়ি এখন দেশ-বিদেশের সাধু, গুরু, বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীদের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। সত্য সু-পথের সন্ধানে এবং মানবতার দীক্ষা নিতে মূল উৎসব শুরুর সপ্তাহখানেক আগে থেকেই ধামে এসে আসন গেড়েছেন অসংখ্য বাউল ও ভক্তবৃন্দ। তারা মাজারের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে পরিবেশন করছেন সাঁইজির আধ্যাত্মিক মর্মবাণী ও ভেদ তথ্যের গান।

​প্রচলিত প্রথা ও সাঁইজির সাধু রীতি অনুসারে আখড়াবাড়ির তিন দিনের মূল আচার-অনুষ্ঠানকে সাজানো হয়েছে। রীতি অনুযায়ী প্রথম দিন শনিবার সন্ধ্যায় বাল্যসেবা অনুষ্ঠিত হয়। অপরদিকে আজ  রবিবার সকালে রাখালসেবা এবং দুপুরে পুণ্যসেবা অনুষ্ঠিত হবে। এসব আচারের পাশাপাশি দিনভর সাধু-গুরুদের মধ্যে ভক্তি, ভাব ও আধ্যাত্মিক দর্শন বিনিময়ের আয়োজন রয়েছে। আয়োজকরা জানান, ‘আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হোক আমাদের দিন বদলের অনুপ্রেরণা’-এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করেই এবারের সব অনুষ্ঠানমালা পরিকল্পিত হয়েছে।

শনিবার বিকেল তিনটায় আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. তৌহিদ বিন-হাসানের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে আখড়াবাড়ির সামনে মরা কালি নদী প্রাঙ্গণে বসেছে ঐতিহ্যবাহী বিশাল গ্রামীণ মেলা। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা মেলায় দুই শতাধিক স্টলে নানা পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন।

​সমাবেশ ও মেলা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি পুরো এলাকা জুড়ে নিয়োজিত রয়েছে এসআরবি এবং সাদা পোশাকের গোয়েন্দা পুলিশ।

আলোচনা সভা শেষে প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা থেকে লালন মঞ্চে বিভিন্ন শিল্পীবৃন্দ ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে লালন সংগীত পরিবেশিত হবে। এতে দেশের খ্যাতনামা বাউল শিল্পীদের পাশাপাশি লালন একাডেমির স্থানীয় শিল্পীরা লালন সাঁইয়ের কালজয়ী গান পরিবেশন করবেন।

ব্রিটিশ শাসকদের নির্মম অত্যাচারে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষকে সত্য ও মানবতার পথ দেখাতে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়াতে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের। জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মানবমুক্তির বার্তা ছড়িয়ে দেন। যৌবনে তীর্থভ্রমণে গিয়ে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে সঙ্গীরা তাকে ত্যাগ করে। পরবর্তীতে কালিগঙ্গা নদী থেকে উদ্ধার পেয়ে মলম শাহর আশ্রয়ে জীবন ফিরে পান এবং সাধক সিরাজ সাঁইয়ের সান্নিধ্যে এসে ফকিরি লাভ করেন।

​ভক্ত মলম শাহর দান করা ১৬ বিঘা জমিতে ১৮২৩ সালে ছেঁউড়িয়ায় গড়ে ওঠে লালন আখড়া। সেখানে প্রথমে খড়ের ঘরে তিনি শিষ্যদের নিয়ে সাধন-ভজন শুরু করেন। লালন প্রায় এক হাজার গান রচনা করেছেন। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ভোরে এই মহান সাধক দেহত্যাগ করলে তার সাধন-ভজনের ঘরের মধ্যেই তাকে সমাহিত করা হয়।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা