শাহাব উদ্দিন আহমদ, শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধিঃ সংসারের অভাব ঘোচাতে আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে যে স্বপ্ন বুকে নিয়ে মরুর দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই সড়কে থেমে গেল শ্রীমঙ্গলের তরুণ প্রবাসী বায়জিদ আহমেদ রায়হানের (২৬) জীবন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহতে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন তিনি। বায়জিদ মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিরাজনগর গ্রামের আব্দুস সালামের ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় বায়জিদ ছিলেন অবিবাহিত। তিনি শ্রীমঙ্গল বার্ডস অ্যান্ড রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র ছিলেন। তিনি দৈনিক জনতার শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি শাহাব উদ্দিন আহমদের মামাতো ভাই।
আমিরাতের গণমাধ্যম ও হাসপাতালের নথি সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৫ মিনিটের দিকে (বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ৫ মিনিট) ফুজাইরাহ-খোরফাক্কান সড়কের ফাওয এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। একটি ফুড ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাওয়ার পথে সড়কের একটি লেনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের সঙ্গে তার মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ফুজাইরাহর শেখ খলিফা হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত ৯টা ৪ মিনিটে মোটরযান দুর্ঘটনাজনিত আঘাতে তার মৃত্যু হয়। অর্থাৎ দুর্ঘটনার মাত্র এক ঘণ্টার মাথায় নিভে যায় একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসার প্রদীপ।
ফুজাইরাহ পুলিশের ট্রাফিক ও টহল বিভাগের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার সালেহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ধানহানি আমিরাতের গণমাধ্যমকে জানান, দুর্ঘটনার কারণ ও পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। চালকদের সতর্ক করে তিনি বলেন, অনেক সময় সড়কের পাশে বা লেনের কাছাকাছি দীর্ঘক্ষণ ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে, তাই এসব যানবাহনের কাছাকাছি গেলে গতি কমানো ও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি।
পরিবার ও স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে সংসারের হাল ধরতে এবং অভাবের দুয়ার থেকে পরিবারকে মুক্ত করতেই প্রবাসজীবন বেছে নিয়েছিলেন রায়হান। কিন্তু আমিরাতে থেকেও তার চোখে ছিল আরও বড় স্বপ্ন—ইউরোপের কোনো দেশে পাড়ি জমানো। উন্নত দেশে যাওয়ার সেই খরচ জোগাতে নিয়মিত কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত কাজ করতেন তিনি, দিনরাত পরিশ্রম করে একটু একটু করে জমাচ্ছিলেন টাকা। ক্লান্তি ভুলে মোটরসাইকেলে শহরের পথে পথে খাবার পৌঁছে দেওয়া সেই তরুণের স্বপ্নযাত্রাই শেষ পর্যন্ত থেমে গেল রাতের এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। যে পথ ধরে তিনি ভাগ্য বদলের লড়াই চালাচ্ছিলেন, সেই পথেই কেড়ে নেওয়া হলো তার প্রাণ, অপূর্ণ রয়ে গেল ইউরোপযাত্রার স্বপ্ন।
বায়জিদের মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছাতেই পুরো সিরাজনগরে নেমে আসে শোকের ছায়া। মা-বাবা, দাদি, চাচা, ভাইবোন, ভাতিজা-ভাতিজিসহ আত্মীয়স্বজনের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ। যে ছেলের পাঠানো টাকায় সংসারে সচ্ছলতা ফেরার আশা দেখছিল পরিবার, আজ তারই মরদেহের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন স্বজনরা। প্রিয় বন্ধুকে হারিয়ে কান্না থামছে না তার বন্ধু ও সাবেক সহপাঠীদেরও। শৈশব-কৈশোরের চেনা মুখটি আর কখনো গ্রামের পথে ফিরবে না—এ সত্য মেনে নিতে পারছেন না কেউ। পরিবারের বড় ছেলেকে হারিয়ে স্বজনরা এখন বাকরুদ্ধ; প্রতিবেশীরা ভিড় করছেন বাড়িতে, সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও যেন হারিয়ে ফেলেছেন তারা।
পরিবার সূত্রে আরও জানা গেছে, আমিরাতে অবস্থানরত বায়জিদের ছোট বোনের স্বামী সুমন মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করছেন। আনুষ্ঠানিকতা শেষে দ্রুত মরদেহ দেশে এনে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হবে। যে ছেলে একদিন সফল হয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, তাকে এখন কফিনবন্দি অবস্থায় শেষবারের মতো বরণ করে নেওয়ার অপেক্ষায় শোকাহত পরিবার ও পুরো গ্রাম।
