সাভার প্রতিনিধি, ফাহাদ-ই-আজম: ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল। বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ব্যাহত হচ্ছে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক কার্যক্রম। পরিস্থিতি বিবেচনায় সোমবার ২৬৪টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ১২ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি আটটি কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ। এরই মধ্যে শ্রমিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে দিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে।
সোমবার বিকেলে শিল্প পুলিশ-২-এর আশুলিয়া অঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. মুমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিক অসন্তোষ ও সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের ২৬৪টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হামলা ও ভাঙচুরের শিকার কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে পিকার্ড বাংলাদেশ লিমিটেড, আর্টিস্টিক ডিজাইন, জনরন সোয়েটার লিমিটেড, ফেরারী গার্মেন্টস লিমিটেড, ডেনিটেক্স লিমিটেড, আনলিমা টেক্সটাইল লিমিটেড, আল ইসলাম টেক্সটাইল লিমিটেড এবং জি কিউ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এ ছাড়া আর্টিস্টিক কারখানার সামনে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলাকালে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
শ্রমিক মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরির অভিযোগ
শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে শ্রমিক নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অভিযোগ উঠেছে, শ্রমিক মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ও উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ধরনের অযাচাইকৃত তথ্য প্রচারের ফলে শ্রমিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। তবে শ্রমিক মৃত্যুর কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও তথ্য যাচাই করা জরুরি।
অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা: ডিআইজি
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনের পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে অন্য কোনো পক্ষের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সোমবার বিকেলে সাভারের উলাইল এলাকায় আল-মুসলীম গ্রুপের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও যারা শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে, তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের কঠোর হাতে দমন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, যারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে, তাদের বিষয়ে পুলিশ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছে। কোনোভাবেই তাদের উদ্দেশ্য সফল হতে দেওয়া হবে না। নাশকতার অভিযোগে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয়ও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে এ পর্যন্ত মোট কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাতে পারেননি তিনি।
হেলমেটধারীদের শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ: জেলা পুলিশ সুপার
অন্যদিকে শ্রমিক আন্দোলনের সময় হেলমেট ও মাস্ক পরা কিছু ব্যক্তির উপস্থিতি এবং তাদের ভূমিকা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, হেলমেটধারীদের বিষয়ে পুলিশ অবগত রয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, শ্রমিকরা কখনো ভাঙচুর ও নাশকতা করেন না। শ্রমিকদের ভেতরে প্রবেশ করে হেলমেট ও মাস্ক পরে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে।
শ্রমিকদের উদ্দেশে পুলিশ সুপার বলেন, পুলিশ সব সময় শ্রমিকদের পাশে রয়েছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো ঘাটতি রাখা হবে না। তাই শ্রমিকদের কাজে ফিরে আসার আহ্বান জানান তিনি। দেশের অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে পুলিশ কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
এ সময় সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলমসহ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাভার-আশুলিয়ার পোশাকশিল্পে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও শিল্পাঞ্চলের স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একদিকে শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মপরিবেশের দাবি, অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাভার-আশুলিয়ার পোশাকশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি।
