শনিবার | নভেম্বর ৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশচট্টগ্রাম দক্ষিণ চট্টগ্রামের ‘সীমের রাজ্য’ পুরানগড়, ফুলে-ফলে ভরে উঠেছে ক্ষেত

দক্ষিণ চট্টগ্রামের ‘সীমের রাজ্য’ পুরানগড়, ফুলে-ফলে ভরে উঠেছে ক্ষেত

পটিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে সাদা ফুল, আর ফুলের আড়ালে উঁকি দিচ্ছে নতুন সীম। যতদূর চোখ যায়, মাঠজুড়ে শুধু সীমের সমারোহ। প্রকৃতির এমন সবুজ সৌন্দর্যে অপরূপ হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার পুরানগড় ইউনিয়নের কৃষিজমি। দেশি জাতের সীম চাষে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত তৈরি করেছে এ জনপদ। স্থানীয়দের কাছে পুরানগড় এখন দক্ষিণ চট্টগ্রামের ‘সীমের রাজ্য’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

ইতোমধ্যে অধিকাংশ ক্ষেতের সীমগাছ ফুলে-ফলে ভরে উঠেছে। আর মাত্র ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে শুরু হতে পারে নতুন মৌসুমের সীম সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ। ভালো ফলন এবং কাঙ্ক্ষিত বাজারদরের আশায় এখন দিন গুনছেন স্থানীয় কৃষকরা।
পুরানগড় ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মনেয়াবাদ এলাকার কৃষক রাশেদ হোসেন দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে সীম চাষের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিবছর ৬ থেকে ৭ কানি জমিতে সীম চাষ করলেও এ বছর বিভিন্ন কারণে মাত্র এক কানি জমিতে চাষ করেছেন তিনি। তাঁর এই চাষাবাদের কাজে পাঁচজন শ্রমিক ও সহযোগী নিয়োজিত রয়েছেন।

কৃষক রাশেদ হোসেন জানান, শুধু পুরানগড় ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডেই প্রায় ১০০ জন সীমচাষি রয়েছেন। এ ছাড়া ইউনিয়নের ১ থেকে ৮ নম্বর ওয়ার্ডেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কৃষক সীম চাষের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে ৩ নম্বর ওয়ার্ডে সীমের ফলন তুলনামূলক বেশি হয় বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে। এসব এলাকায় মূলত দেশি জাতের সীম চাষ করা হয়।

এক কানি জমিতে লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন কৃষক রাশেদ হোসেনের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কানি জমিতে আনুমানিক ৭০০ থেকে ৯০০ কেজি সীম এবং ১০০ থেকে ২০০ কেজি সীমের বীজ পাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে তাঁর এক কানি জমির সীমগাছ ফুলে-ফলে পরিপূর্ণ।

তিনি আশা করছেন, আগামী ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে সীম সংগ্রহ শুরু করতে পারবেন। বাজারে প্রতি কেজি সীম প্রায় ১৫০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারবেন বলেও আশাবাদী তিনি।

রাশেদ হোসেন জানান, প্রতি কানি জমিতে সীম চাষ করতে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং কাঙ্ক্ষিত বাজারদর পাওয়া গেলে এক কানি জমি থেকে প্রায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার সীম ও বীজ বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সঠিক পরিচর্যা ও ভালো বাজারদর পেলে সীম চাষ কৃষকদের জন্য লাভজনক কৃষি উদ্যোগে পরিণত হতে পারে।

সরকারি সহায়তায় কারও প্রাপ্তি, কারও অপেক্ষা সীম চাষে সরকারি সহায়তা নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র অভিজ্ঞতা। কয়েকজন কৃষক বিভিন্ন সময়ে কৃষি বিভাগ থেকে সহযোগিতা পাওয়ার কথা জানালেও অনেকে এখনো কোনো সরকারি সহায়তা পাননি।

কৃষক রাশেদ হোসেন বলেন, প্রায় ৫ থেকে ৬ বছর আগে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তিনি কিছু সহায়তা পেয়েছিলেন। তবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত কোনো সহযোগিতা পাননি।

স্থানীয় কৃষকদের প্রত্যাশা, পুরানগড়ে সীম চাষের ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে কৃষি বিভাগ যেন সব কৃষকের জন্য সমানভাবে প্রয়োজনীয় বীজ, সার, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির পরামর্শ ও অন্যান্য সহযোগিতা নিশ্চিত করে। পাশাপাশি উৎপাদিত সীমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজারজাতকরণেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

পরিকল্পিত উদ্যোগে বদলে যেতে পারে কৃষি অর্থনীতি কৃষকদের মতে, পুরানগড়ের মাটি ও পরিবেশ সীম চাষের জন্য সম্ভাবনাময়। পরিকল্পিত উদ্যোগ, কৃষি বিভাগের নিয়মিত তদারকি এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলে সীম চাষ আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।

এতে একদিকে যেমন স্থানীয় কৃষকদের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়বে, অন্যদিকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের কৃষি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

সবুজে ঘেরা সীমের ক্ষেত, কৃষকের নিরলস পরিশ্রম আর ভালো ফলনের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে পুরানগড় এখন দক্ষিণ চট্টগ্রামের কৃষিতে এক সম্ভাবনাময় জনপদ। কৃষকদের স্বপ্ন, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে একদিন পুরানগড়ের সীম দেশের বিভিন্ন বাজারে আরও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করবে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা