মো আব্দুল মান্নান: টিটু ভাই একজন মানুষ, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি অপূরণীয় শূন্যতা। মানুষের জীবনে কিছু কিছু মানুষ থাকেন, যাদের পরিচয় শুধু একটি পেশা, একটি পদবি কিংবা একটি সামাজিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তারা নিজেদের কর্ম, প্রজ্ঞা, মানবিকতা এবং ব্যক্তিত্বের গুণে একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেন। এমন মানুষদের চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, একটি সমাজ, একটি পেশাজীবী মহল এবং কখনো কখনো একটি জাতির জন্যও অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রয়াত অ্যাডভোকেট আমিনুল গনি টিটু ছিলেন তেমনই একজন বিরল ব্যক্তিত্ব।
আজ যখন তাঁর স্মৃতিচারণ করতে বসি, তখন মনে হয় একজন মানুষকে নিয়ে লেখা মানে যেন একটি ইতিহাসের অংশকে তুলে ধরা। কারণ তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী, যুক্তিবাদী, বিচক্ষণ এবং বহুমাত্রিক জ্ঞানের অধিকারী একজন মানুষ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি নিজের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের ছাপ রেখে গেছেন। কর্মক্ষেত্রে ছোট-বড় সকলের কাছে তিনি ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র। তাঁর ব্যবহার, চিন্তাধারা এবং মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মনোভাব তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
আমার ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর সঙ্গে পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠভাবে তাঁকে দেখার সুযোগ হয়েছে। এ সুযোগকে আমি আমার জীবনের একটি বড় প্রাপ্তি বলে মনে করি। অনেক মানুষের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়, কিন্তু সবাই হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিতে পারেন না। টিটু ভাই ছিলেন সেই বিরল কয়েকজন মানুষের একজন, যিনি তাঁর আচরণ ও মানবিক গুণাবলীর মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছেন।
তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গুণ ছিল সত্য কথা বলার সাহস। তিনি কখনোই জনপ্রিয় হওয়ার জন্য কিংবা কাউকে খুশি করার জন্য সত্যকে আড়াল করতেন না। যুক্তি এবং তথ্যের ভিত্তিতে তিনি নিজের মতামত তুলে ধরতেন। তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল দৃঢ়তা, তেমনি ছিল প্রজ্ঞার দীপ্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সমাজের উন্নতির জন্য সত্য বলা এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা জরুরি। এ কারণেই তিনি ছিলেন একজন স্পষ্টভাষী মানুষ, যিনি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে জানতেন না। আইন পেশায় তাঁর পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তা ছিল ঈর্ষণীয়। একজন আইনজীবী হিসেবে তিনি শুধু আইনের ধারাগুলো জানতেন না, তিনি আইনের চেতনা এবং ন্যায়বিচারের দর্শনও গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। তাঁর কাছে আইন ছিল কেবল জীবিকা অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং মানুষের অধিকার রক্ষার একটি মহৎ দায়িত্ব। আদালতপাড়ায় তাঁর গ্রহণযোগ্যতা, সহকর্মীদের শ্রদ্ধা এবং মক্কেলদের আস্থা প্রমাণ করে যে তিনি কতটা দক্ষ এবং সৎ একজন আইনজীবী ছিলেন। আমি একাধিকবার মোহাম্মদপুরে তাঁর বাসায় এবং চেম্বারে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। প্রতিবারই তাঁর আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি অতিথিদের সময় দিতেন, খোঁজখবর নিতেন এবং প্রাণখোলা হাসিতে সবাইকে আপন করে নিতেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি বড় দিক ছিল এই সহজ-সরল এবং মানবিক আচরণ। বড় মানুষ হওয়ার পরও তিনি কখনো নিজেকে বড় মনে করতেন না। টিটু ভাইয়ের সঙ্গে আলাপচারিতায় যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করেছি, তা হলো তাঁর জ্ঞানের গভীরতা। সমাজ, রাজনীতি, আইন, শিক্ষা, সংস্কৃতি কিংবা আন্তর্জাতিক বিষয়—যে কোনো বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করলে মনে হতো তিনি বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন। কিন্তু তিনি কখনো নিজের জ্ঞান নিয়ে অহংকার করতেন না। বরং তিনি অন্যদের মতামত শুনতেন, আলোচনা করতেন এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ বজায় রাখতেন। বর্তমান সমাজে এমন মানুষ খুব কমই দেখা যায়, যারা জ্ঞানের সঙ্গে বিনয়কে একসঙ্গে ধারণ করতে পারেন। টিটু ভাই সেই বিরল ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে নম্র করে তোলে। তাঁর জীবনাচরণে সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পেতাম। তিনি ছিলেন গয়হাটা শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ ফাউন্ডেশনের একজন গর্বিত আজীবন সদস্য। সংগঠনের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতা ছিল অসাধারণ। সমাজের কল্যাণে কাজ করার জন্য তিনি সবসময় উৎসাহ দিতেন। শিক্ষা বিস্তার, মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল অনুকরণীয়। তিনি মনে করতেন, একটি জাতির উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা এবং নৈতিকতা।
তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের একটি সহজাত গুণ ছিল। তিনি কাউকে ছোট করতেন না, আবার প্রয়োজন হলে সঠিক দিকনির্দেশনাও দিতেন। তাঁর পরামর্শ অনেক মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। তরুণ প্রজন্মের প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ মমত্ববোধ। তিনি সবসময় চাইতেন নতুন প্রজন্ম সৎ, দক্ষ এবং মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক।
মানুষের জীবনের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তার মৃত্যুর পর। একজন মানুষ চলে যাওয়ার পর সমাজ যদি তাকে স্মরণ করে, তার জন্য কাঁদে, তার অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে—তবে বুঝতে হবে তিনি সফল জীবন যাপন করেছেন। টিটু ভাইয়ের প্রয়াণে যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে, তা প্রমাণ করে তিনি কত মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন।
তাঁর মৃত্যুসংবাদ যখন শুনলাম, তখন প্রথমে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। সদা হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত এবং কর্মচঞ্চল একজন মানুষ এত দ্রুত আমাদের ছেড়ে চলে যেতে পারেন—এ বাস্তবতা মেনে নেওয়া সহজ নয়। মনে হচ্ছিল, হয়তো তিনি আবার ফিরে আসবেন, আবার কোনো আলোচনায় অংশ নেবেন, আবার তাঁর সেই পরিচিত হাসি দিয়ে সবাইকে স্বাগত জানাবেন। কিন্তু মৃত্যু যে চিরন্তন সত্য, তা আমাদের মেনে নিতেই হয়।
আজ তাঁর অনুপস্থিতিতে আমরা হারিয়েছি একজন প্রিয় বড় ভাইকে। তাঁর পরিবার হারিয়েছে একজন অভিভাবককে। তাঁর সহকর্মীরা হারিয়েছেন একজন বিশ্বস্ত সহযোদ্ধাকে। আইন অঙ্গন হারিয়েছে একজন মেধাবী এবং বিচক্ষণ আইনজীবীকে। আর সমাজ হারিয়েছে একজন মানবিক, জ্ঞানী এবং দায়িত্বশীল মানুষকে।
একজন মানুষের শূন্যতা কখনো কখনো এত গভীর হয় যে তা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব হয় না। টিটু ভাইয়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক তেমন। তাঁর অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা, মানবিকতা এবং নেতৃত্বগুণের বিকল্প খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না। তিনি যে মূল্যবোধ ধারণ করতেন, যে আদর্শ অনুসরণ করতেন এবং যে পথ দেখিয়ে গেছেন, সেটিই হতে পারে তাঁর প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি। মৃত্যু মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায় হলেও একজন সৎ ও কর্মময় মানুষের প্রভাব কখনো শেষ হয় না। তাঁর কর্ম, তাঁর শিক্ষা, তাঁর আদর্শ এবং তাঁর স্মৃতি বেঁচে থাকে মানুষের হৃদয়ে। টিটু ভাইও সেভাবেই আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। তাঁর সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো, তাঁর উপদেশ, তাঁর হাসি এবং তাঁর মানবিক আচরণ আমাদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে। এই পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মানুষের ভালোবাসা। সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা খ্যাতি একদিন হারিয়ে যায়; কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে স্থান তৈরি করা যায়, তা চিরস্থায়ী হয়ে থাকে। টিটু ভাই সেই বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী ছিলেন। তাঁর প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা আমরা দেখছি, তা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
আজ আমরা মহান আল্লাহর দরবারে তাঁর জন্য দোয়া করি। আল্লাহ তাআলা যেন তাঁর সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেন, তাঁর কবরকে জান্নাতের বাগিচাসমূহের একটি বাগিচায় পরিণত করেন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন। আমিন।
একই সঙ্গে আমরা তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্যও দোয়া করি। আল্লাহ তাআলা যেন তাঁদের এই শোক ও বেদনা সহ্য করার শক্তি দান করেন, ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দেন এবং তাঁদের ওপর তাঁর অশেষ রহমত বর্ষণ করেন।
প্রয়াত অ্যাডভোকেট আমিনুল গনি টিটু হয়তো আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর কর্ম এবং তাঁর স্মৃতি আমাদের পথ দেখাবে। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সত্যনিষ্ঠা, জ্ঞান, মানবিকতা এবং সততার মাধ্যমে একজন মানুষ কীভাবে সমাজে স্থায়ী প্রভাব রেখে যেতে পারেন। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন। আমীন।
৫৫
