জাহাঙ্গীর খান বাবু: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর তালিকা করলে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের নাম প্রথম সারিতেই থাকবে। রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে হাতে নেওয়া এই প্রকল্প শুধু ব্যয়ের দিক থেকেই নয়, প্রশাসনিক গুরুত্বের কারণেও সবসময় আলোচনায় ছিল। প্রায় ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পকে বাংলাদেশের রেলওয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল রেল প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কিন্তু প্রকল্পটির অগ্রগতি, ব্যয় বৃদ্ধি, চুক্তি বাস্তবায়ন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠে এসেছে। সেই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এসেছে সরকারি অডিট আপত্তি, বিশেষ নিরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায়। প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পরিচালিত বিশেষ অডিট মিলিয়ে প্রকল্পটিতে মোট ১৫০টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে।
নথিতে দেখা যায়, এই ১৫০টি আপত্তির মধ্যে ৮১টি এসএফআই (Serious Financial Irregularity) এবং ৬৯টি নন-এসএফআই। এর মধ্যে ৬৪টি আপত্তি নিষ্পত্তি এবং আরও ২টি আংশিক নিষ্পত্তি হয়েছে। অর্থাৎ মোট ৬৬টি আপত্তির নিষ্পত্তি দেখানো হয়েছে। তবে এখনও ৮৪টি আপত্তি অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ৬২টি এসএফআই এবং ২২টি নন-এসএফআই।
অডিট পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উত্থাপিত ৫টি আপত্তির মধ্যে মাত্র ২টি নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ৪টি আপত্তির একটিও নিষ্পত্তি হয়নি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ৫টির মধ্যে ৩টি নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে উত্থাপিত ৫৮টি আপত্তির মধ্যে ৩৬টি নিষ্পত্তি হলেও ২২টি এখনও ঝুলে আছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের ১৯টি আপত্তির মধ্যে ১১টি নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের ১৭টির মধ্যে ৭টি নিষ্পত্তি হয়েছে। অন্যদিকে প্রকল্পের ওপর পরিচালিত বিশেষ অডিটে উত্থাপিত ৪২টি আপত্তির মধ্যে মাত্র ৫টি নিষ্পত্তি হয়েছে, বাকি ৩৭টি এখনো অনিষ্পন্ন।
নথিপত্রে দেখা যায়, অনিষ্পন্ন আপত্তির একটি অংশ জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যালয়ে এবং আরেকটি অংশ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পর্যায়ে আটকে আছে। হিসাব অনুযায়ী, ২৩টি আপত্তি জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন অফিসে এবং ১২টি আপত্তি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রকল্পটিতে উত্থাপিত অডিট আপত্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় আলোচিত অভিযোগ হলো স্পেসিফিকেশনবহির্ভূত ব্যালাস্ট সরবরাহের পরও ঠিকাদারকে ১৮৪ কোটি ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৬ টাকা পরিশোধ। অডিট পর্যবেক্ষণে বলা হয়, নির্ধারিত মানদণ্ডের বাইরে সরবরাহ করা উপকরণের জন্য এই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আপত্তিতে বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে সিডি, ভ্যাট ও আরডি রিইম্বার্সমেন্ট বাবদ ৪৩ কোটি ৫৮ লাখ ৫৬ হাজার ৬৬৪ টাকা পরিশোধের মাধ্যমে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। একই মেজারমেন্ট শিট ব্যবহার করে দুইবার বিল পরিশোধের কারণে ২৮ লাখ ৭৭ হাজার ৯০০ টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগও অডিট প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
এ ছাড়া প্রকৃত কাজের তুলনায় ২৪ কোটি ৮৭ লাখ ১০ হাজার ৮৬২ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ, খননকাজের স্যালভেজ ভ্যালুর ১২ কোটি ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭০ টাকা ঠিকাদারের বিল থেকে সমন্বয় না করা, ডিফর্মড বারের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ, চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করেও বিল গ্রহণ, পিপিআর-২০০৮ এবং আরডিপিপির বাইরে কাজ সম্পাদন, টেন্ডার সিডিউলের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া এবং অব্যবহৃত সরকারি অর্থ ফেরত না দেওয়ার মতো একাধিক অভিযোগ বিভিন্ন অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পটি মূলত ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনের জন্য নেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় নতুন রেললাইন, স্টেশন, সেতু, কালভার্ট, সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির একটি বড় অংশের অর্থায়ন হয়েছে বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে। ফলে প্রকল্পে ব্যয়ের প্রতিটি ধাপ শুধু জাতীয় পর্যায়ে নয়, আন্তর্জাতিক অর্থদাতা সংস্থার কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুরু থেকেই প্রকল্পের ব্যয়, সময়সীমা এবং কাজের পরিধি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ছিল। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের মাধ্যমে ব্যয় ও সময় একাধিকবার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি ব্যাখ্যায় ভূমি অধিগ্রহণ, নকশাগত পরিবর্তন, অতিরিক্ত কাজ এবং বাস্তবায়ন জটিলতার কথা বলা হলেও সমালোচকদের মতে, ব্যয় বৃদ্ধির সব কারণ এখনো জনসমক্ষে পরিষ্কার নয়।
এই প্রকল্পের দীর্ঘদিনের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন মো. আফজাল হোসেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ সময়জুড়ে তিনি নেতৃত্বে ছিলেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে প্রকল্পের অডিট আপত্তি এবং তার বর্তমান দায়িত্ব—দুটি বিষয়ই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সরাসরি বিস্তারিত মন্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে তিনি অডিট নিষ্পত্তিসংক্রান্ত বিভিন্ন নথি পাঠান। সেই নথি অনুযায়ী, অডিটে উত্থাপিত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি ইতোমধ্যে বিদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে।
নথিতে দেখা যায়, ১৮৪ কোটি টাকার ব্যালাস্ট আপত্তি, অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, স্যালভেজ ভ্যালু, ভ্যাট ও ট্যাক্স রিইম্বার্সমেন্টসহ একাধিক আর্থিক আপত্তি পৃথক পৃথক চিঠির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রেলওয়ের পক্ষের যুক্তি হলো, অডিট আপত্তি উত্থাপিত হওয়া মানেই চূড়ান্তভাবে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়া নয়। অডিট কর্তৃপক্ষ ব্যাখ্যা, নথিপত্র এবং বাস্তব তথ্য পর্যালোচনা করে অনেক আপত্তি নিষ্পত্তি করেছে।
তবে এখানেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। কারণ অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি মানেই সব ক্ষেত্রে অর্থ ফেরত এসেছে বা অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে—এমন ব্যাখ্যা অডিট বিশেষজ্ঞরা দেন না। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নথি, প্রশাসনিক ব্যাখ্যা অথবা নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেও আপত্তি নিষ্পত্তি হয়ে থাকে। ফলে প্রশ্ন রয়ে গেছে—অভিযোগে উল্লেখিত অর্থের কতটা পুনরুদ্ধার হয়েছে, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না এবং কোন যুক্তিতে আপত্তিগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে।
রেলওয়ের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, বিষয়টি এখন আর শুধু পদ্মা রেল প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বৃহৎ সরকারি প্রকল্পে জবাবদিহিতা, রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, ৬৬টি আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে—এটি যেমন একটি তথ্য, তেমনি ৮৪টি আপত্তি এখনও অনিষ্পন্ন—এটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।
ফলে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে উত্থাপিত অডিট আপত্তি, নিষ্পত্তিকৃত আপত্তির প্রকৃতি, অনিষ্পন্ন আপত্তির ভবিষ্যৎ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রশ্ন আরও বড় হয়ে সামনে আসছে। আর সেই কারণেই ১৫০ অডিট আপত্তির ছায়া এখনো রেলওয়ের ওপর থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি।
