কক্সবাজার থেকে রিয়াজ উদ্দিন: পাহাড়ি ও জঙ্গল ঘেরা দুর্গম কাঁচা রাস্তা। দূর থেকে কয়েকজন মানুষ একটি বাঁশের ডুলিতে করে এক রোগীকে কাঁধে নিয়ে হেঁটে আসছে। চারপাশের পরিবেশ একদম প্রত্যন্ত।
ডিজিটাল বাংলাদেশ পেরিয়ে দেশ এখন স্মার্ট বাংলাদেশের মহাসড়কে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও কক্সবাজারের রামু উপজেলার বেংডেবা গ্রামে এখনো থমকে আছে আদিম যুগের এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। যেখানে রোগীকে হাসপাতালে নিতে কোনো আধুনিক বাহন নয়, একমাত্র ভরসা মানুষের কাঁধ।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন মানুষ কাঁধে করে একজন অসুস্থ রোগীকে নিয়ে যাচ্ছেন। পাশে রয়েছে একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো। দৃশ্যটি কোনো দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের নয়; এটি কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বেংডেবা গ্রামের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে দেশ এগিয়ে চললেও প্রায় ১০০ পরিবারের এই গ্রামটি এখনো মৌলিক অবকাঠামোগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও এখানে নির্মিত হয়নি চলাচল উপযোগী সড়ক, প্রয়োজনীয় সেতু কিংবা বিদ্যুৎ সংযোগ। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ, অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছেন গ্রামবাসী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৫০ বছর ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হলেও মাত্র দুই কিলোমিটার রাস্তা এবং কয়েকটি ছোট সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। ফলে কাদামাটি, পাহাড়ি ছড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়েই চলাচল করতে হয় এলাকাবাসীকে।
চিকিৎসা নিতে গিয়ে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি:
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় জরুরি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে। স্থানীয়দের দাবি, রাস্তা ও সেতুর অভাবে অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ছড়া ও খাল পানিতে তলিয়ে গেলে রোগীদের বাঁশের খাটিয়া বা মানুষের কাঁধে বহন করে কয়েক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় গত কয়েক দশকে অন্তত ২০ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। রাতের অন্ধকারে রোগী পরিবহনের সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, “জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা তো দূরের কথা, মোটরসাইকেল পর্যন্ত গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা পাওয়া ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে।”
উৎপাদন হয়, বাজারে পৌঁছায় না কৃষিপণ্য
বেংডেবা মূলত কৃষিনির্ভর এলাকা। এখানে ধান, শাকসবজি, মৌসুমি ফলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে কৃষকরা সময়মতো এসব পণ্য বাজারে নিতে পারেন না।
কৃষকদের অভিযোগ, পরিবহন সংকটের কারণে অনেক সময় পণ্য নষ্ট হয়ে যায় অথবা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়। এতে উৎপাদন খরচও উঠে আসে না। ফলে এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষা যেন এক যুদ্ধ
যোগাযোগ সংকটের প্রভাব পড়েছে শিক্ষাক্ষেত্রেও। গ্রামের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার দুর্গম পথ অতিক্রম করে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় যেতে হয়।
বর্ষাকালে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হতে পারে না। স্থানীয়দের মতে, সড়ক ও সেতুর অভাবে অনেকেই মাঝপথে লেখাপড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকলেও যাতায়াত সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কক্সবাজার সরকারি কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী আবুল হাসনাত আল-আমিন বলেন, “জন্মের পর থেকে দেখে আসছি আমাদের গ্রাম এখনো সরকারের মৌলিক উন্নয়ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সড়ক, বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক সুবিধার অভাবে মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছে। আমরা দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ চাই।”
সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মিয়া বলেন, “রামুর অন্যান্য এলাকায় উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও আমাদের গ্রাম এখনো পিছিয়ে আছে। দ্রুত সমস্যাগুলোর সমাধান করা হোক।”
বিদ্যুৎহীনতায় থমকে আধুনিক জীবন:
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও গ্রামটিতে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। সীমিত সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে কিছু পরিবার রাতের অন্ধকার দূর করার চেষ্টা করছে। মোবাইল ফোন চার্জ দিতে অনেককে কয়েক কিলোমিটার দূরে যেতে হয়।
দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সংযোগের কারণে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী এবং অনলাইন সেবাগ্রহীতারা মারাত্মক সমস্যায় পড়ছেন। ডিজিটাল সেবার যুগে এমন পরিস্থিতি স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে।
বন বিভাগের আপত্তিতে থমকে উন্নয়ন?
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিলেই বন বিভাগের আপত্তির মুখে পড়তে হয়। ফলে বছরের পর বছর ধরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।
জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য একরামুল হক বাবুল বলেন, “এটি আমার ওয়ার্ডের দীর্ঘদিনের অবহেলিত রাস্তা। প্রায় একশ বছর ধরে এখানে মানুষের বসবাস হলেও রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নিলেই বন বিভাগের বাধার মুখে পড়তে হয়। নির্বাচনের সময় অনেকেই প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না।”
জোয়ারিয়ানালা বিট কর্মকর্তা বাদন ধর বলেন, “প্রস্তাবিত রাস্তা নির্মাণ করা হলে বন বিভাগের গাছ কেটে সহজে সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বনাঞ্চলের নিরাপত্তা ও গাছ সংরক্ষণের স্বার্থে আমরা আপত্তি জানিয়ে আসছি।”
তবে স্থানীয়দের দাবি, বন সংরক্ষণ ও জনস্বার্থের মধ্যে সমন্বয় করে পরিবেশবান্ধব নকশায় রাস্তা ও সেতু নির্মাণ করা সম্ভব।
প্রতিশ্রুতি আছে, বাস্তবায়ন নেই:
গ্রামবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনের সময় বিভিন্ন প্রার্থী রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুতের প্রতিশ্রুতি দিলেও ভোটের পর আর কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে বছরের পর বছর একই সমস্যার মধ্যে আটকে আছে বেংডেবা।
এ বিষয়ে জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল শামশুদ্দিন আহাম্মদ প্রিন্সের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাত্র দুই কিলোমিটার সড়ক ও কয়েকটি সেতু নির্মাণের মাধ্যমে শতাধিক পরিবারের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব করা সম্ভব। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক উন্নত করা গেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
গ্রামবাসীর দাবি, উন্নয়নের সুফল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছানোর কথা থাকলেও বেংডেবা গ্রাম এখনো অবহেলা ও বঞ্চনার প্রতীক হয়ে আছে। তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ, এলজিইডি এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
