স্টাফ রিপোর্টার: সারাদেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, নিয়োগ পাওয়া স্বাস্থ্যকর্মীদের ৮০ শতাংশই নারী হবেন, যারা পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন।
এ সময় চিকিৎসকদের ওপর যাতে দেশের মানুষের আস্থা এবং বিশ্বাস ফিরে আসে, সে জন্য তাদের আরও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের লক্ষ্য। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা আমরা দেশের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চাই।
গতকাল শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ এই নীতিকে সামনে রেখে সরকার স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করছে। পুষ্টি, টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ সম্পর্কে আগেভাগে স্বাস্থ্যপরামর্শ নিশ্চিত করা গেলে অনেক রোগ শুরুতেই প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, একটি সুস্থ জাতি শুধু হাসপাতাল নির্মাণের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না। পারিবারিক সচেতনতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনাচরণের মাধ্যমে মানুষের সুস্থতা নিশ্চিত হয়। সে লক্ষ্যেই সরকার প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে হাসপাতালগুলোতে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য পেশাজীবীর শূন্যপদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, দেশের ইতিহাসে এবারই স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে এটি জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু বাজেট বাড়ানো নয়, সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতেও সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, হার্টের ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনেটর, পেরিফেরাল ভাসকুলার স্টেন্ট, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন ফাইবার, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কয়েকটি কাঁচামালের ওপর ভ্যাট ও কর কমানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারও করা হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানÑপ্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই প্রতিষ্ঠান শুধু দক্ষ চিকিৎসকই নয়, সমাজনেতা, গবেষক, শিক্ষক ও মানবসেবায় নিবেদিত অসংখ্য মানুষ গড়ে তুলেছে। চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একজন চিকিৎসকের পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন চিকিৎসকের আন্তরিক ব্যবহার ও পরামর্শ অনেক সময় রোগীর কাছে ওষুধের মতোই কার্যকর হয়ে ওঠে। তাই চিকিৎসকদের মানুষের বিপদের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেলফি উৎসবে শিক্ষার্থীরা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ৮০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে যোগ দেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। প্রধানমন্ত্রী ও ক্যাম্পাসের সাবেক শিক্ষার্থী জুবাইদা রহমানকে কাছে পেয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন বর্তমান শিক্ষার্থীরা। প্রিয় ক্যাম্পাসের ‘বড় বোন’কে ঘিরে শুরু হয় সেলফি উৎসব, আর শিক্ষার্থীদের আনন্দে সামিল হন প্রধানমন্ত্রী নিজেও। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাই। একসময় এই প্রতিষ্ঠানে তিনি নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন। ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখকে দীর্ঘ দিন পর কাছে পেয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন বর্তমান শিক্ষার্থীরা। প্রিয় ‘বড় বোন’কে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুরু হয় সেলফি তোলার উৎসব। অনেকেই এই বিশেষ মুহূর্ত স্মরণীয় করে রাখতে তার সঙ্গে ছবি তুলতে ভিড় করেন। শিক্ষার্থীদের এই আনন্দে সামিল হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও। তিনি নিজে থেকেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেলফি তোলেন এবং তাদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে সময় কাটান। এতে ক্যাম্পাসের আনন্দঘন পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এ সময় ডা. জুবাইদা রহমানও যেন ফিরে যান তার পুরোনো দিনগুলোতে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গল্প, আড্ডা ও স্মৃতিচারণে কিছু সময় কাটান তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
এরআগে সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ক্যাম্পাসে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। তার সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. জুবাইদা রহমান। প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে সকাল থেকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা হয়ে ঢামেকের উদ্দেশে রওনা হয়। শহীদ মিনার এলাকায় পৌঁছালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, তিতুমীর কলেজ এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সড়কের দুই পাশে অবস্থান নিয়ে স্লোগান ও শুভেচ্ছার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।
