ইসতিয়াক ইমন: ১২ আগস্ট, আন্তর্জাতিক যুব দিবস। মানবসভ্যতার ইতিহাসে তরুণ সমাজ সর্বদাই পরিবর্তন, সামাজিক প্রগতি ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি। যেকোনো রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং টেকসই প্রগতির সবচেয়ে বড় নিয়ামক তার ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশ। অথচ অত্যন্ত বেদনার বিষয় হলো, যে তরুণদের কাঁধে ভর দিয়ে একটি জাতির ভবিষ্যতের সমৃদ্ধ মানচিত্র আঁকার কথা, আমাদের দেশের রাজপথগুলো প্রতিনিয়ত তাদের জন্য পরিণত হচ্ছে একেকটি নির্মম কাঠামোগত মৃত্যুকূপে। ফলে যুব দিবসের আনুষ্ঠানিক উদযাপন এবং ফাঁকা প্রতিশ্রুতির আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এক গভীর, ধারাবাহিক ও অনালোচিত সামাজিক ট্র্যাজেডি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)-এর ‘গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি’ এবং বিশ্বব্যাংকের নীতিপত্রগুলোর দিকে তাকালে এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান উন্মোচিত হয়। তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের অকালমৃত্যুর একক প্রধান কারণ হলো রোডক্র্যাশ। ‘গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ’ -এর বিশ্বজনীন স্বাস্থ্য তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী মহামারি বা সংক্রামক রোগের চেয়েও রোড ক্র্যাশত রুণ মানবসম্পদ ধ্বংস করতে বেশি ভূমিকা রাখছে। আমাদের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশে যেখানে ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনফ্লেক্স’ বা মানবসম্পদ বৃদ্ধি পাওয়া জরুরি, সেখানে একজন উদীয়মান তরুণের অকালমৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্ব কেবল একটি পরিবারের চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাওয়া নয়; এটি দেশের জিডিপির প্রত্যক্ষ ক্ষতি এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উৎপাদিকা শক্তির এক অপূরণীয় পতন। অর্থনৈতিক সমীক্ষা বলে, রোড ক্র্যাশ এর ফলে সৃষ্ট এই ক্ষতি প্রতিবছর বহু নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের জাতীয় আয়ের প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ সমপরিমাণ আর্থিক মূল্য শোষণ করে নেয়।
ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের দেশে রোড ক্র্যাশকে চালক বা পথচারীর ‘ব্যক্তিগত অসাবধানতা’ বা ‘ভাগ্যের লিখন’ হিসেবে চিহ্নিত করার একটি অগভীর প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু আধুনিক পরিবহন অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এখন ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এই আধুনিক দর্শনের মূল তত্ত্ব হলো—মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়; মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্র ও সড়ক অবকাঠামোর মূল দায়িত্ব হলো এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ ও প্রযুক্তিগত নজরদারি গড়ে তোলা, যেন মানুষের একটি সামান্য ভুল কখনো প্রাণঘাতী পরিণতিতে রূপ না নেয়।
‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ মূলত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত: নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো (ঝুঁকিমুক্ত রোড ডিজাইন ও ইন্টারসেকশন), নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা বা ট্রমা কেয়ার ব্যবস্থা। এই দর্শনে সড়কের সার্বিক নকশা, ‘কাইনেটিক এনার্জি’ বা গতির বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা এবং গতিসীমা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যেন অনিচ্ছাকৃত কোনো সংঘর্ষ ঘটলেও সেই আঘাতের তীব্রতা মানুষের সহ্যক্ষমতার বাইরে না যায়। আমাদের মতো দেশে যেখানে সড়ক ডাইভারশন, অপরিকল্পিত ডিভাইডার ও ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চরম অভাব রয়েছে, সেখানে এই সিস্টেমিক চিন্তার প্রয়োগ ছাড়া কেবল পুলিশি কড়াকড়ি দিয়ে সড়ক নিরাপদ করা অসম্ভব।
একইসঙ্গে আমাদের নজর দিতে হবে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’-এর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দিকে। ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে নতুন ‘সড়ক পরিবহন আইন’ গঠিত হলেও, রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও প্রয়োগকারী সংস্থার অদক্ষতার কারণে এর কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি। একটি আধুনিক সড়ক নিরাপত্তা আইন কেবল শাস্তি নির্ধারণে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। আইন বাস্তবায়নে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ায় ‘ডিজিটাল অটোমেশন’ চালু করা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাজপথ থেকে স্থায়ীভাবে বাজেয়াপ্ত বা ডাম্পিং করা, বাণিজ্যিক যানবাহনের চালকদের জন্য কর্মঘণ্টা সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া এবং আইন অমান্যকারীদের ক্ষেত্রে অপরাধের আনুপাতিক হারে বড় অংকের আর্থিক ও আইনি দণ্ড বহাল রাখা জরুরি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি সড়ক নিরাপত্তা আইনকে তখনই সার্থক বলা যায়, যখন তা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে রুদ্ধ করে এবং সড়ক পরিবহন খাতের মালিক ও শ্রমিক সিন্ডিকেটের অশুভ প্রভাবকে কঠোরভাবে দমন করতে পারে।
তবে কেবল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বা আইনি কাঠামোর ওপর দায় চাপিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কাঠামোগত ব্যর্থতার বাইরেও তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত দিকটিও নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আচরণগত বিজ্ঞান ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের আলোকে দেখা যায়, যুবসমাজের মানসিক গঠনে ঝুঁকি নেওয়ার (Risk-taking Behavior) একটি সহজাত প্রবৃত্তি কাজ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে তৈরি হওয়া সস্তা জনপ্রিয়তার মেকি মোহ, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করার ন্যাক্কারজনক প্রবণতা, হেলমেটহীন ড্রাইভ এবং গতিসীমা তোয়াক্কা না করে বাইক স্টান্ট করার সংস্কৃতি আমাদের বহু তরুণের জীবনকে অকালে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। এছাড়া গাড়ি ড্রাইভ করা বা হাঁটাহাঁটির সময় স্মার্টফোনে বুঁদ হয়ে থাকার ‘ডিসট্র্যাক্টেড ড্রাইভিং/ওয়াকিং’ এখন বিশ্বজুড়ে এক নতুন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক যুব দিবসে এই বিপজ্জনক সামাজিক আচরণ ও মানসিক ঝোঁক নিয়ে আত্মপর্যালোচনা করা যুবসমাজের জন্য আবশ্যক। সাহসিকতা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন বেপরোয়া আচরণ কখনোই সমার্থক হতে পারে না।
জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৩.৬ অনুচ্ছেদে বিশ্বজুড়ে রোড ক্র্যাশ এ মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার রয়েছে এবং ১১.২ অনুচ্ছেদে নিরাপদ ও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা কোনো দয়া-দাক্ষিণ্য নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের বেঁচে থাকা ও স্বাধীনভাবে চলাচলের সাংবিধানিক ও মৌলিক মানবাধিকার। তরুণরা রাজপথে জীবন বিসর্জন দেওয়ার জন্য জন্ম নেয়নি, তারা এসেছে এই সমাজ ও রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব নিয়ে। আন্তর্জাতিক যুব দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—আমরা যেন স্রেফ অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর মোটাতাজা জিডিপির আত্মতুষ্টিতে বুঁদ হয়ে না থাকি। সড়ক পরিবহন খাতকে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর আওতায় এনে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তরুণদের রক্তে ভেসে যাওয়া রাজপথ নয়, আমরা চাই এমন এক পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ সড়ক—যেখানে প্রতিটি সম্ভাবনাময় স্বপ্ন গতি পাবে, কিন্তু কোনো প্রাণ অকালে ঝরে পড়বে না।
লেখক: ইসতিয়াক ইমন
কর্মী, বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন
ইমেইল: estiak৬৬emon@gmail
