শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ কটাক্ষকে জয় করে কৃষিতে কলেজ ছাত্র সাকিবুল ইসলাম শান্ত’র বিপ্লব

কটাক্ষকে জয় করে কৃষিতে কলেজ ছাত্র সাকিবুল ইসলাম শান্ত’র বিপ্লব

এস,এম সিপার, পিরোজপুর সংবাদদাতা : সাকিবুল ইসলাম শান্ত একজন কলেজশিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই তার কৃষির প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষি চাষে যুক্ত হন। পড়াশোনা শেষ করে যেন চাকরির পেছনে ছুটতে না হয়-এই লক্ষ্য নিয়েই তিনি কৃষিকে নিজের ভবিষ্যৎ হিসেবে বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। অল্প সময়ের মধ্যেই এলাকায় সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন এই কলেজছাত্র।‎‎

পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার চিরাপাড়া পারসাতুরিয়া ইউনিয়নের চিরাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা জাকির হোসেনের ছেলে সাকিবুল
ইসলাম শান্ত। তিনি কাউখালি সরকারি কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তার বাবাও একজন কৃষক। বাবার কাছ থেকে এবং কৃষি অফিসের পরামর্শে কৃষির নানা অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জ্ঞান অর্জন করেছেন তিনি।

সাকিবুল ইসলাম শান্তর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই তার কৃষিকাজের প্রতি গভীর আগ্রহ জন্মায়। শান্ত শাকসবজি নিয়ে চাষাবাদ করার খুবই আগ্রহী। বয়স কম হওয়ার কারনে কৃষি কাজ সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারবে না এবং আর্থিক সাপোর্টও কম ছিল সব মিলিয়ে পরিবার তাকে এই কাজ করতে নিষেধও করেন। ধীরে ধীরে তার পরিশ্রম ও সফলতা দেখে তার বাবা পাশে দাঁড়ান।‎‎
তার বাবা জাকির হোসেনের ও কাউখালি উপজেলার কৃষি অফিসের সহযোগিতা পাওয়ার পর কৃষিকাজে তার গতি ও আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।

উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে এসএসিপি প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে ৫০ শতাংশ জমিতে গ্রীষ্মকালীন লাউ চাষ করেছেন তিনি। আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করেূ রাসায়নিক সারের পরিবর্তে নিজস্বভাবে উৎপাদিত কেঁচো সার এবং কীটনাশকের পরিবর্তে হলুদ আঠালো ফাঁদ ও ফেরোমোন ট্র্যাপ ব্যবহার করছেন এই তরুন কৃষি উদ্যোক্তা।
সাকিবুল ইসলাম শান্ত জানান, গত বছর লাউ চাষ করে প্রায় ৫০ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছি। এ বছর ইতোমধ্যে প্রায় ৩ হাজার টাকার লাউ ও লাউশাক বিক্রি হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার লাউ ও লাউশাক বিক্রির আশা করছি। কৃষিকাজ থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারের প্রয়োজনেও সহায়তা করছি। তিনি আরও বলেন, অনেকেই মনে করেন লেখাপড়ার পাশাপাশি কৃষিকাজ করা সম্ভব নয়। আমি প্রমান করতে চাই, আধুনিক কৃষি পদ্ধতি অনুসরন করলে একজন শিক্ষার্থীও কৃষিকে আয়ের উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

কৃষিকাজের মাধ্যমেই তার পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন এসেছে।‎‎কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিতে যুক্ত হওয়ার কারনে একসময় এলাকার কিছু মানুষ ও সহপাঠীদের কাছ থেকে তাকে কটূক্তির শিকারও হতে হয়েছে। অনেকেই তার এই কাজকে নেতিবাচকভাবে দেখতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার সাফল্যই সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছে। বর্তমানে কৃষিতে সফলভাবে এগিয়ে যাওয়ার কারনে সেই মানুষগুলোর কাছ থেকেই এই শিক্ষার্থী প্রশংসা কুড়াচ্ছেন।

কাউখালি উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, তরুণদের কৃষির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। শান্ত সেই উদ্যোগেরই একজন সফল উদাহরন।

উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাইনুল হুদা বলেন, শান্ত উদ্যমী ও পরিশ্রমী তরুন কৃষি উদ্যোক্তা। কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে লাউ চাষ করছেন। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে কেঁচো সার, ফেরোমোন ট্র্যাপ এবং হলুদ আঠালো ফাঁদের ব্যবহার কৃষির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। তার এ উদ্যোগ তরুনদেরও কৃষিমুখী হতে উৎসাহিত করবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সোমা রানী দাস বলেন, বর্তমান সময়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সাকিবুল ইসলাম শান্ত সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছেন। একজন কলেজ শিক্ষার্থী হয়েও তিনি কৃষিকে পেশা ও আয়ের উৎস হিসেবে গ্রহন করেছেন, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কৃষি অফিস সবসময় তার পাশে রয়েছে। আগামীতেও যতোরকমের সাহায্য ও সহযোগিতা তার লাগবে সেটা অব্যাহত থাকবে।

কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, তরুন প্রজন্মের মধ্যে কৃষির প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি। সাকিবুল ইসলাম শান্ত দেখিয়ে দিয়েছেন যে, শিক্ষার পাশাপাশি কৃষিতেও সফল হওয়া সম্ভব। তার মতো উদ্যোগী তরুণরা শুধু নিজেদের স্বাবলম্বী করছে না, বরং দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমি তার উত্তরোত্তর সফলতা কামনা করছি এবং অন্যান্য তরুণদেরও এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাই।

সাকিবুল ইসলাম শান্ত আরো জানান, কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে তিনি কখনোই চাকরিনির্ভর জীবন চায় না। তার মতে, পড়াশোনা হলো নিজের ব্যক্তিগত একাডেমিক ও নৈতিক অর্জন। পড়াশোনা করলেই যে চাকরি করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।‎‎ কৃষি খাতে তার আগ্রহ ও স্কিল ভালো হওয়ায় তিনি বিশ্বাস করেন, এই পেশার মাধ্যমে ভবিষ্যতে ভালো কিছু করা সম্ভব এবং একইসঙ্গে দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখা যাবে।‎‎ ‎‎ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে এই উদ্যোক্তা বলেন, পড়াশোনা শেষ করে কৃষিকে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে নিতে চাই। আগামী হরেকরকমের শাক-সবজি চাষের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে আধুনিক চারা উৎপাদনের জন্য একটি নার্সারি এবং গবাদিপশুর খামার করার ইচ্ছা আছে। সেখানে এলাকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।‎‎

সবশেষে এই কলেজছাত্র বলেন, তার জন্য সবাই যেন দোয়া করেন—তিনি যেন কৃষিতে ভালো কিছু করতে পারেন। তার বিশ্বাস দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কৃষিতে শিক্ষিত তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই দেশ আরও এগিয়ে যাবে। তার বিশ্বাস দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কৃষিতে শিক্ষিত তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই দেশ আরও এগিয়ে যাবে।‎‎

স্থানীয়দের মতে, সাকিবুল ইসলাম শান্তর এসফল উদ্যোগ উপজেলার শিক্ষিত তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। আধুনিক ও নিরাপদ কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, তেমনি কৃষিকে সম্মানজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা রাখছেন। শান্ত আজ অনেক বেকার তরুণের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরন।

 

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা