শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ সবুজের অরণ্যগাথা: চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলে মেঘ-বৃষ্টির কাব্য

সবুজের অরণ্যগাথা: চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলে মেঘ-বৃষ্টির কাব্য

জাহাঙ্গীর খান বাবু: শ্রীমঙ্গল-যার নামের সমার্থক শব্দই যেন এক টুকরো স্নিগ্ধ সবুজ। দিগন্তজোড়া চায়ের বাগান আর রূপালী পাহাড়ি ছড়ার মায়াবী মেলবন্ধনে গড়া এই জনপদকে অবলীলাক্রমেই বলা হয় বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী। নাগরিক কোলাহল আর ইট-পাথরের জঞ্জাল থেকে মুক্তি পেতে ভ্রমণপিয়াসী মানুষ কিংবা অভিজাত পরিবারের অবকাশ যাপনের জন্য শ্রীমঙ্গলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ গন্তব্য আর দুটি নেই। ঢাকা থেকে যানজটহীন রাস্তায় মাত্র ৫ ঘণ্টাতেই পৌঁছানো যায় এই সবুজের রাজ্যে। যারা রাতের ট্রেন জার্নি পছন্দ করেন, তারা উপবন বা উপত্যকায় চড়ে ভোরের আলো ফুটতেই পা রাখতে পারেন চায়ের দেশে। এছাড়া সকাল ও দুপুরেও রয়েছে ট্রেনের সুবিধা। তবে ট্রেন যাদের পছন্দ নয়, তাদের জন্য রয়েছে আধুনিক বাস সার্ভিস। সায়েদাবাদ বা ফকিরাপুল থেকে সোহাগ, শ্যামলী, হানিফ পরিবহনের বিলাসবহুল এসি বাসের পাশাপাশি কম ভাড়ার লোকাল বাসও দিনরাত ২৪ ঘণ্টা চলাচল করে। অবশ্য বাসে কখনো কখনো সড়ক পরিস্থিতির কারণে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টাও লেগে যেতে পারে।

​পুরো উপজেলা জুড়ে বিছিয়ে আছে চায়ের সবুজ গালিচা। ছোট ছোট টিলা, আর সেই টিলার বুক চিরে নেমে গেছে চায়ের সারি। জনবসতিহীন এই নিস্তব্ধতায় কেবলই প্রকৃতির রাজত্ব। এখানে ফিনলে কোম্পানির সুবিশাল চা বাগানগুলোর বুক চিরে চলে গেছে প্রধান সড়ক, যেখান দিয়ে পর্যটকবাহী গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এক অনন্য অনুভূতি। চলন্ত গাড়ি থেকে দেখা যায়, মাথায় কাপড়ের পট্টি আর পিঠে ঝুড়ি (ডুলা) বেঁধে দলবেঁধে নারী চা শ্রমিকরা নিখুঁত হাতে দুটি পাতা একটি কুঁড়ি তুলছেন—এ যেন কোনো জীবন্ত ক্যানভাস! একটু সামনে এগোলেই চোখে পড়বে লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এ বনের গহীনে দেখা মেলে বিরল প্রজাতির উল্লুক, চশমাপরা হনুমানসহ নানা বন্যপ্রাণী। বনের বুক চিরে বয়ে চলা ছোট ছোট পাহাড়ি নদী আর ঝিরিপথ পর্যটকদের আকুল করে টানে। প্রকৃতির এই অপার রূপকে ছুঁয়ে দেখতেই এখানে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মানের বেশ কিছু রিসোর্ট। আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে জলজ পাখিদের মেলা দেখতে চাইলে ঘুরে আসা যায় বিখ্যাত ‘বাইক্কা বিল’ ওয়েটল্যান্ড স্যাঙ্কচুয়ারি থেকে।
​নিরাপত্তার দিক থেকে শ্রীমঙ্গল দেশের অন্যতম শীর্ষ ও শান্তিপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র। টুরিস্ট পুলিশের সার্বক্ষণিক নজরদারির পাশাপাশি প্রতিটি চা বাগানের নিজস্ব কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বাগানের ভেতরে চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ট্রেইল বা পথ অনুসরণ করাই শ্রেয়।
​বিলাসবহুল আতিথেয়তার জন্য এখানে রয়েছে ৫-স্টার মানের ‘গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ’। সুবিশাল ১৩.২ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এই রিসোর্টে শুধু দেশীয় আভিজাত্যই নয়, বরং ইউরোপ-আমেরিকার পর্যটকদের উপযোগী সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এর থ্রিডি মুভি থিয়েটার, অ্যামিবা আকৃতির বিশাল নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার সুইমিং পুল আর ৯-হোল গলফ কোর্স লাক্সারি লাইফস্টাইলকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আবার যারা কম খরচে থাকতে চান, তাদের জন্য শ্রীমঙ্গল বাস স্ট্যান্ড বা শহরের আশেপাশে রয়েছে মানসম্মত বাজেট হোটেল।
​গ্র্যান্ড সুলতানের পথ পেরিয়ে খানিকটা এগোলেই রাধানগর এলাকা। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে এই রাধানগর পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। এখানকার ‘আমার বাড়ি রিসোর্ট’-এ একটি রাত কাটানো মানেই এক অদ্ভুত প্রশান্তি। এর সুইমিং পুল আর সকালের বুফে ব্রেকফাস্টের মেনু দেখলে মনে হবে আপনি হয়তো শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডি লেকের ধারের কোনো রিসোর্ট কিংবা লঙ্কাউই দ্বীপপুঞ্জের কোনো লাক্সারি কটেজে আছেন! মালদ্বীপের মালের বিলাসবহুল রিসোর্টগুলোর চেয়ে ভাড়া এখানে অনেক সাশ্রয়ী হলেও, সেবার মান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনন্য।
​শ্রীমঙ্গলের গ্রামগুলো বৈচিত্র্যে ভরা। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা খাসিয়া পুঞ্জিগুলোতে গেলে দেখা মেলে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনধারা। স্থানীয় হাটে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে খাসিয়া নারী-পুরুষদের কেনাকাটার দৃশ্য শ্রীমঙ্গলের ক্যানভাসকে আরও রঙিন করে।
​ঋতু বৈচিত্র্যের এই শহরে বর্ষার রূপ সবচেয়ে মোহনীয়। দেশের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হওয়া এই অঞ্চলে যখন মুষলধারে বৃষ্টি নামে, তখন ‘চাঁদের গাড়ি’ (খোলা জিপ) নিয়ে চা বাগানের পিচঢালা পথ ধরে ছুটে চলা এক স্বর্গীয় অনুভূতি সৃষ্টি করে। আবার শীতের আমেজও এখানে দেশের অন্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি নিবিড়। তবে শ্রীমঙ্গল ভ্রমণের মূল মন্ত্র হলো—যাওয়ার আগেই অনলাইনে হোটেল বা রিসোর্টের রুম বুকিং করে নেওয়া। সরাসরি গিয়ে বুকিং করতে গেলে ভরা পর্যটন মৌসুমে চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হতে পারে। তাই সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে, প্রিয়জনকে সাথে নিয়ে আগামী ছুটির গন্তব্য হিসেবে বেছে নিন চিরসবুজের শ্রীমঙ্গলকে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা