শাহাব উদ্দিন আহমদ. শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধিঃ মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযানে তিন দিনে ৮ হাজার ৯০০ ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত একাধিক যন্ত্রপাতি জব্দ ও মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে টানা অভিযানের মুখে বালু উত্তোলনকারী চক্র কৌশল বদলে এখন সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত তৎপর হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শনিবার (১ আগস্ট) বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত আশিদ্রোন ইউনিয়নের সাইটুলা, রাধানগর ও ভুরভুরিয়া ছড়া এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. জিয়াউর রহমান। অভিযানে অংশ নেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিনহাজুল ইসলাম ও শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের সদস্যরা।
অভিযানে সাইটুলা এলাকায় হেকিম মিয়ার লেবুবাগানের পাশের ছড়া থেকে সদ্য উত্তোলিত প্রায় ৩০০ ঘনফুট বালুভর্তি একটি ট্রাক ও বালু উত্তোলনের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, লেবুবাগানের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সেখানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করে আসছিল। প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযুক্তরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা যায়নি। পরে হেকিম মিয়াকে প্রধান আসামি করে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এবং ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ অনুযায়ী শ্রীমঙ্গল থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার (৩১ জুলাই) ভূনবীর ইউনিয়নের আলিসার কুল (বরপাড়া) এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় আট হাজার ঘনফুট বালু, একটি এক্সকাভেটর (ভ্যাকু) মেশিন, পাঁচটি বালু উত্তোলন যন্ত্র ও প্রায় এক হাজার ফুট পাইপ জব্দ করা হয়। এ সময় অবৈধ পাইপ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তা ধ্বংস করা হয়। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ৫ নম্বর কালাপুর ইউনিয়নের শেভরন গ্যাস কোম্পানি ও গারো লাইনের মধ্যবর্তী এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকালে অবৈধভাবে উত্তোলিত আনুমানিক ৬০০ ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়।
একের পর এক অভিযান ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকার প্রশংসা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশকর্মীরা। তাঁরা এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, অভিযানের চাপে বালু উত্তোলনকারীরা দিনের বেলার পরিবর্তে সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত গোপনে কার্যক্রম চালাচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত বধ্যভূমি চা-বাগান সংলগ্ন গাং থেকে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন চা শ্রমিক বস্তা, বড় বাউল ও টুকরিতে করে বালু বহন করে চা-বাগানের ভেতরে নিয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, এ কার্যক্রম বহু বছর ধরে চলে আসছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন—প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণ বালু কোথায় যাচ্ছে, কার নির্দেশে তা উত্তোলন করা হচ্ছে এবং এর নেপথ্যে কারা রয়েছে। বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করে প্রকৃত হোতাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এলাকাবাসী মনে করেন, শুধু জরিমানা করে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা যাবে না। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, জেল-জরিমানা এবং অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু, এক্সকাভেটর (ভ্যাকু) মেশিন, ড্রেজার, পাইপ, ট্রাক্টর, ট্রাকসহ ব্যবহৃত সব ধরনের যন্ত্রপাতি জব্দ করে রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী এসব যন্ত্রপাতি ধ্বংস বা অকার্যকর করে দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তাঁরা, যাতে ভবিষ্যতে কেউ পরিবেশ ধ্বংস করে বালু উত্তোলনের সাহস না পায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, দিনের পাশাপাশি রাত ও ভোরবেলায় বিশেষ নজরদারি এবং সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হলে অবৈধ বালু উত্তোলনকারী চক্রকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হবে। নেপথ্যে থাকা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা গেলেই শ্রীমঙ্গলের নদী-ছড়া, পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তাঁরা।
