শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ পিরোজপুরে শিক্ষার্থীদের দোরগোড়ায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি

পিরোজপুরে শিক্ষার্থীদের দোরগোড়ায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি

এস এম সিপার, পিরোজপুর প্রতিনিধি : একটি বই হাতে নিয়েই পাতা উল্টাচ্ছে একদল শিক্ষার্থী। কেউ খুঁজছে গল্পের বই, কেউ আবার বিজ্ঞান বা ইতিহাসের বই। বিদ্যালয়ের পোশাক পরা শিক্ষার্থীদের এমন ব্যস্ততা একটি ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির গাড়িকে ঘিরে। প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি শিশু-কিশোরদের আগ্রহ যখন বাড়ছে, তখন বইকে তাদের কাছে পৌঁছে দিতে পিরোজপুরের বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি।

‘আলোকিত মানুষ চাই’ স্লোগানকে সামনে রেখে পরিচালিত এ কার্যক্রমের মাধ্যমে পিরোজপুর জেলার চারটি উপজেলার ৪৪টি স্পটে পাঠকদের বই পড়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী লাইব্রেরির গাড়ি পাড়া-মহল্লা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে যায়। সেখানে প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা অবস্থান করে পাঠকদের বই দেওয়া-নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সহযোগিতায় বাস্তবায়নাধীন ‘দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি (৩য় সংশোধিত)’ প্রকল্পের আওতায় এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন পর্যায়ে দেশব্যাপী কার্যক্রমটি পুনরায় শুরু হয়েছে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশের ৬৪ জেলার ৩৬৮টি উপজেলায় প্রায় ৩ হাজার ২০০টি লোকালয়ে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির কার্যক্রম চলছে। সপ্তাহের নির্ধারিত দিনে লাইব্রেরির গাড়ি বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে পাঠকদের বই পড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির গাড়িতে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, বিজ্ঞান, ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয়ের বই রাখা হয়। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী পাঠকেরাও নিজেদের পছন্দ ও আগ্রহ অনুযায়ী বই বেছে নিতে পারেন। ফলে যেসব এলাকায় স্থায়ী পাঠাগারের সুবিধা সীমিত, সেসব এলাকার মানুষের কাছেও বই পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

লাইব্রেরির সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়াটিও সহজ। ১০০ টাকা অথবা ২০০ টাকা জামানত এবং মাসিক ১০ টাকা হারে ছয় মাসের অগ্রিম ৬০ টাকা বই রক্ষণাবেক্ষণ ফি দিয়ে পাঠকেরা সদস্য হতে পারেন। সদস্যরা নির্ধারিত নিয়মে লাইব্রেরি থেকে বই সংগ্রহ করে পড়ার সুযোগ পান।

শুধু বই পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এ কার্যক্রম। এর সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংঘের মাধ্যমে পাঠচক্র, আড্ডা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের বই পড়ার পাশাপাশি সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বর্তমানে শিশু-কিশোরদের বড় একটি অংশ মোবাইল ফোন, গেম ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাটাচ্ছে। এতে তাদের নিয়মিত বই পড়া, সৃজনশীল চর্চা ও মননশীলতার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের কাছে বই পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বই শুধু তথ্য বা জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতা বিকাশের পাশাপাশি মূল্যবোধ ও মানবিকতা গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে শিশু-কিশোর বয়সে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হলে ভবিষ্যতে তাদের জ্ঞানচর্চা ও মননশীলতার ভিত্তি আরও শক্ত হয়।

পিরোজপুরে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের আগ্রহের দৃশ্যও সেই সম্ভাবনার কথাই মনে করিয়ে দেয়। বইভর্তি গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের পছন্দের বই খুঁজে নেওয়া শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে দেখা যায় কৌতূহল ও আনন্দ। প্রযুক্তির বিস্তারের এই সময়েও বই যে শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করতে পারে, তাদের উপস্থিতিই যেন তার প্রমাণ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশুদের হাতে দীর্ঘ সময়ের জন্য মোবাইল ফোন তুলে দেওয়ার পরিবর্তে বয়স ও আগ্রহ অনুযায়ী একটি ভালো বই তুলে দেওয়া যেতে পারে। পরিবারের উৎসাহ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে শিশু-কিশোরদের মধ্যে আবারও পাঠাভ্যাস তৈরি করা সম্ভব। আর সেই লক্ষ্যেই পিরোজপুরের পাড়া-মহল্লায় পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি—বইয়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা