চাঁদপুর থেকে এ কে আজাদ: যে সন্তানদের বুকে আগলে রেখে বড় করেছেন, যাদের মুখে হাসি ফোটাতে জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন, বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়া সেই মায়ের জন্যই শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল ছয় ছেলের ঘরের দরজা। অসুস্থ শরীর নিয়ে এক মাস চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেও নিজের আশ্রয়টুকু খুঁজে পেলেন না ৮৫ বছর বয়সী জয়নব ভানু। ছেলেদের ঘরের দরজায় বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পাননি সাড়া। বুকভরা কষ্ট আর অভিমানে শেষ পর্যন্ত দরজার সামনেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি।
একসময় যাঁর আঁচলের ছায়ায় বড় হয়েছে ছয় সন্তান, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই মাকেই আশ্রয়ের জন্য ছুটতে হলো মেয়ের বাড়িতে। ছয় ছেলের সংসারে ঠাঁই না হলেও মেয়ে ঝর্ণা বেগমের ঘরের দরজা খুলেছে মায়ের জন্য। বর্তমানে মেয়ের বাড়িতেই আশ্রয় নিয়েছেন অসহায় এই বৃদ্ধা।
ঘটনাটি চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের পূর্ব কাদরা গ্রামের। জয়নব ভানু ওই গ্রামের মৃত সৈয়দ আহমেদের স্ত্রী। বহু বছর আগে স্বামীকে হারানোর পর সন্তানদের ঘিরেই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন। কিন্তু জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় এসে আশ্রয়, নিরাপত্তা আর আপনজনের সান্নিধ্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই যেন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দরজায় দরজায় অপেক্ষা তবু মিলিয়ে নিয়ে আশ্রয়, গত ১৮ অক্টোবর দুপুরে ছেলেদের বাড়িতে গিয়েও আশ্রয় না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন জয়নব ভানু। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ এক মাস কুমিল্লায় চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়িতে ফিরে ছেলেদের ঘরে প্রবেশ করতে পারেননি তিনি। একের পর এক দরজায় টোকা দিয়েছেন, ডেকেছেন ছেলেদের। অপেক্ষা করেছেন—হয়তো কেউ দরজা খুলে বলবে, ‘মা, ভেতরে এসো।’ কিন্তু তাঁর সেই অপেক্ষার অবসান হয়নি।
একসময় দরজার সামনেই বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এ সময় স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাঁকে দেখতে পেয়ে কাছে যান এবং খোঁজখবর নেন। তাঁদের সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বৃদ্ধা একটি আকুতি জানান—স্বামীর ভিটায় তাঁর জন্য যেন একটি ছোট্ট কুঁড়েঘর তৈরি করে দেওয়া হয়। জীবনের শেষ দিনগুলো অন্তত নিজের পরিচিত মাটিতে, মাথা গোঁজার সামান্য একটি ঠাঁইয়ে কাটাতে চান তিনি।
৮৫ বছরের এক মায়ের এই আকুতি যেন শুধু একটি ঘরের আবেদন নয়; এটি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আপনজনের কাছে আশ্রয় চাওয়ার আর্তি। বিলাসবহুল বাড়ি কিংবা আরাম-আয়েশ নয়, তাঁর চাওয়া কেবল সামান্য একটু নিরাপদ আশ্রয়।
মেয়ের কন্ঠে ২ দশকের অভিযোগ, বৃদ্ধা মায়ের এমন দুরবস্থার খবর পেয়ে ছুটে আসেন মেয়ে ঝর্ণা বেগম। মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি অভিযোগ করেন, প্রায় ২০ বছর ধরে তাঁর মায়ের সঙ্গে এমন আচরণ করা হচ্ছে।
ঝর্ণা বেগম বলেন, “মায়ের খবর শুনে আমি ছুটে আসি। বিশ বছর ধরে তারা আমার মায়ের সঙ্গে এমন আচরণ করছে। তারা চায়, আমার মাকে আমার বাড়িতে তুলে দিতে।”
ছয় ছেলের মধ্যে দুজন শাহজাহান ও আবুল কাশেম গ্রামের বাড়িতে বসবাস করেন। বাকি চার ছেলে প্রবাসে থাকেন বলে জানা গেছে। তবে কেন বৃদ্ধা মাকে ছেলেদের ঘরে আশ্রয় নিতে বেগ পেতে হয়েছে, তা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
পরিবারের বক্তব্যে বিভিন্ন দাবি, জয়নব ভানুর অভিযোগের বিষয়ে তাঁর মেজো ছেলে আবুল কাশেম দাবি করেন, দীর্ঘ এক বছর তাঁর মা কোথায় ছিলেন, তা তিনি জানেন না। তিনি মাকে কয়েকবার ডেকেছেন বলেও জানান।
বড় ছেলে শাহজাহানের স্ত্রী বলেন, বৃদ্ধা তাঁদের ঘরের দরজার সামনে কয়েক মিনিট বসেছিলেন। এরপর কী হয়েছে, তা তিনি জানেন না। সেজো ছেলে আনোয়ার হোসেনের স্ত্রীও দাবি করেন, জয়নব ভানু কখন এসেছেন, সে বিষয়ে তাঁরা অবগত নন।
পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যের সঙ্গে বৃদ্ধা ও তাঁর মেয়ের অভিযোগের এই ভিন্নতা ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে একজন প্রবীণ মানুষের নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা ও দেখভাল নিশ্চিত করা যে জরুরি, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
প্রশাসনের উদ্যোগ আর সমাধানের অপেক্ষা, ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় ক্ষোভ ও সহানুভূতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের খান ঘটনাটিকে হৃদয়বিদারক উল্লেখ করে বলেন, বিষয়টি এলাকাবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চিতোষী পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলম বেলাল বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে বার্ধক্যে একজন মায়ের সঙ্গে এমন ঘটনা সত্যিই হৃদয়বিদারক। সামাজিকভাবে ছেলেদের বিচার হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।”
ঘটনার খবর পাওয়ার পর মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা খাতুন বৃদ্ধার পরিবারের সদস্যদের তাঁর কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে খোঁজখবর নেন।
শেষ বয়সে মায়ের চাওয়া শুধুমাত্র একটু আশ্রয়, সবশেষে ছেলেদের ঘরে ঠাঁই না পেয়ে মেয়ে ঝর্ণা বেগমই মাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। বর্তমানে সেখানেই রয়েছেন ৮৫ বছর বয়সী জয়নব ভানু।
তবে মায়ের মনের গভীরে রয়ে গেছে একটি ছোট্ট স্বপ্ন—স্বামীর ভিটায় একটি কুঁড়েঘর। যেখানে তিনি নিশ্চিন্তে মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবেন, পরিচিত মাটির সঙ্গে শেষ দিনগুলো কাটাতে পারবেন। জীবনের সায়াহ্নে এসে তাঁর চাওয়া এতটুকুই।
একজন মা কত কষ্টে সন্তানদের বড় করেন, কত ত্যাগ স্বীকার করে তাঁদের জীবনের পথে এগিয়ে দেন—তার হিসাব হয়তো কোনো দিনই মেলানো সম্ভব নয়। অথচ সেই মায়েরই যখন শেষ বয়সে আশ্রয়ের জন্য দরজায় দরজায় অপেক্ষা করতে হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে আমাদের পারিবারিক বন্ধন, মানবিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে।
জয়নব ভানুর ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে যথাযথ অনুসন্ধান ও পারিবারিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে তাঁর নিরাপদ বাসস্থান, চিকিৎসা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, বার্ধক্যে একজন মায়ের সবচেয়ে বড় চাওয়া হয়তো দামি বাড়ি কিংবা সম্পদ নয়—সন্তানের একটু স্নেহ, দুবেলা নিরাপদে থাকার নিশ্চয়তা আর এমন একটি আশ্রয়, যেখানে তাঁকে নিজেকে বোঝা মনে করতে হবে না।
