মো. রাসেল মিয়া, মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিরিধি : ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ভক্তদের অশ্রুসজল চোখের মধ্য দিয়ে বিদায় নিলেন দেবী দুর্গা। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। বিজয়া দশমীতে আনন্দ, ভক্তি আর বিদায়ের বেদনায় ভারী হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপগুলোর পরিবেশ। দেবীকে বিদায় জানাতে গিয়ে অনেকের চোখে ছিল জল, কণ্ঠে ছিল একটাই প্রত্যাশা—‘আসছে বছর আবার হবে!’
বুধবার সকাল থেকেই বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দেবী দর্শন, পূজা-অর্চনা ও অঞ্জলি দিতে ভিড় করেন ভক্তরা। শেষবারের মতো দেবীর চরণে প্রণাম জানিয়ে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও বিশ্বকল্যাণ কামনা করেন তাঁরা। কোথাও কোথাও বিবাহিত নারীরা সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন। দেবীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে এবং একে অপরকে সিঁদুর রাঙিয়ে তাঁরা উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেন।
সন্ধ্যার পর শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি। ঢাক-ঢোলের বাদ্য, কাঁসর, শঙ্খধ্বনি আর ‘জয় মা দুর্গা’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে রাজপথ। সুসজ্জিত ট্রাক ও শোভাযাত্রায় প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা এগিয়ে যান নির্ধারিত বিসর্জনস্থলের দিকে। নাচ-গান, উলুধ্বনি ও ভক্তিমূলক স্লোগানে শোভাযাত্রায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে সেই আনন্দের মাঝেও ছিল প্রিয় দেবীকে বিদায় জানানোর গভীর বিষাদ।
নদী, খাল ও বিভিন্ন জলাশয়ে মন্ত্রোচ্চারণ ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে একে একে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। প্রতিমা জলে বিলীন হওয়ার মুহূর্তে ভক্তরা হাত জোড় করে প্রার্থনা করেন—পৃথিবী থেকে দূর হোক অশুভ শক্তি, প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণ। দেবীর বিদায়বেলায় তাঁদের কণ্ঠে বারবার ধ্বনিত হয়, ‘আসছে বছর আবার হবে, মা দুর্গার আগমন হবে।’
প্রতিমা বিসর্জনের এই বিদায়লগ্নে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। মুরাদনগরের পূজামণ্ডপের ভক্ত রাজীব সাহা আক্ষেপ মেশানো কণ্ঠে বলেন, “পাঁচটি দিন কীভাবে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না। মা দুর্গার আগমন আমাদের মনে যে আনন্দের জোয়ার এনেছিল, আজ তাঁর বিদায়ে মনটা ভারী হয়ে গেছে। প্রার্থনা করি, মা যেন আগামী বছর আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসেন।”
আরেক নারী ভক্ত প্রতিমা রানী অশ্রুসজল চোখে বলেন, “মাকে আজ কৈলাসে বিদায় দিতে গিয়ে বুকটা ফেটে কান্না আসছে। মা আমাদের সন্তানতুল্য, তাই চোখের জল ধরে রাখতে পারছি না। তবে মায়ের কাছে একটাই প্রার্থনা, তিনি যেন সবার জীবন থেকে সমস্ত দুঃখ-অশুভ শক্তি দূর করে শান্তি ও সমৃদ্ধি দান করেন।”
বিসর্জন শেষে শুরু হয় বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়। কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে নতুন করে দৃঢ় হয় সম্প্রীতির বন্ধন। ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ ছাপিয়ে এ সময় মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা।
প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গা ফিরে গেলেন কৈলাসে। রেখে গেলেন মহিষাসুরের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের চিরন্তন বার্তা। দেবী বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু ভক্তদের হৃদয়ে রয়ে গেছে তাঁর প্রতি অগাধ বিশ্বাস, আগামী দিনের আশাবাদ আর আবারও ফিরে পাওয়ার আকুল অপেক্ষা। তাই বিদায়ের বিষাদ ছাপিয়ে সবার কণ্ঠে একটাই প্রত্যয়—‘বিদায় মা, আবার এসো। আসছে বছর আবার হবে!’
