বুধবার | অক্টোবর ২৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ ‎ শিবচরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও প্রাণনাশের হুমকির প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন

‎ শিবচরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও প্রাণনাশের হুমকির প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন

‎শাখাওয়াত হোসেন মোল্লা, ‎শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধিঃ ‎মাদারীপুরের শিবচরে দুর্গাপূজামণ্ডপে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিন সাংবাদিকের ওপর হামলা, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত, পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পূজামণ্ডপে সংঘটিত ঘটনার সার্বিক বিষয়ে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিজয় টেলিভিশনের শিবচর উপজেলা প্রতিনিধি অপূর্ব চৌধুরী জয়।
‎
‎মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় শিবচরের অবস্থিত মাদারীপুর জেলা পরিষদের ডাক বাংলোতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি এসব অভিযোগ তুলে ধরেন এবং প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
‎
‎সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গত ২২ অক্টোবর রাতে শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর ইউনিয়নের ঠাকুরবাজার এলাকার একটি দুর্গাপূজামণ্ডপে বিশৃঙ্খলা ও মারামারির ঘটনা ঘটেছে বলে জানতে পারেন সাংবাদিকরা। জনস্বার্থে ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে বিজয় টিভির প্রতিনিধি অপূর্ব চৌধুরী জয় তাঁর দুই সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে যান।

ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর পূজামণ্ডপের সভাপতি সুকুমার কর্মকারের ছেলে দুর্জয় কর্মকার তাঁদের ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে তিন সাংবাদিকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও আঘাতপ্রাপ্ত করেন। তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হয়। পরে আহত সাংবাদিকদের সরকারি হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
‎
সংবাদ সম্মেলনে অপূর্ব চৌধুরী জয় বলেন, সাংবাদিকরা কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ বা উদ্দেশ্য নিয়ে যাননি। তাঁরা পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে একটি ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে গিয়েছিলেন। এ সময় তাঁদের ওপর হামলা ও লাঞ্ছনার ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।
‎
‎পূজামণ্ডপে সরকারি নির্দেশনা অমান্য ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ করে ‎সংবাদ সম্মেলনে শুধু সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগই নয়, সংশ্লিষ্ট দুর্গাপূজামণ্ডপে পূজার কার্যক্রম পরিচালনা নিয়েও একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়।
‎
দুর্গাপূজা উদযাপন উপলক্ষে প্রশাসনের নির্ধারিত সময়সূচি ও নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। নির্ধারিত সময়ের পরও পূজামণ্ডপে কার্যক্রম চলছিল বলে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। এ ছাড়া দেড় শতাধিক তরুণের উপস্থিতিতে ডিজে পার্টির আয়োজন এবং সেখানে মদ্যপানের অভিযোগও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।

‎আয়োজকদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ব্যাখ্যা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়গুলো তদন্তের দাবি জানান।
‎ প্রশ্ন, পূজামণ্ডপে যদি নির্ধারিত সময়ের পরও কার্যক্রম চলতে থাকে এবং সেখানে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল? সেখানে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
‎
‎সাংবাদিকদের দাবি, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ, ছবি, চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি যাচাই করা জরুরি।
‎সাংবাদিকদের হুমকি ও ক্যামেরা নদীতে ফেলে দেওয়া।

‎সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার পর বাদল কর্মকার নামের এক ব্যক্তি সাংবাদিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দমকি প্রধান করা হয়।
‎
এ ঘটনায় সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন অপূর্ব চৌধুরী জয়।

তিনি সংবাদ প্রকাশ বা তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে কারও আপত্তি থাকলে প্রচলিত আইন ও নিয়ম অনুযায়ী প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কোনো সাংবাদিককে ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া কিংবা তাঁর পেশাগত সরঞ্জাম নষ্ট করার হুমকি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
‎
‎এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া গেলে তা-ও গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা।
‎
মা লক্ষ্মী জুয়েলার্সের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তের দাবি গুরুত্বপূর্ণ অংশে শিবচরের মা লক্ষ্মী জুয়েলার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রশ্ন তুলে ধরা হয়।
‎
‎লিখিত বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে স্বর্ণালংকারের লেনদেন, গ্রাহকদের সঙ্গে বিরোধ, আর্থিক অনিয়ম, স্বর্ণালংকার ভাঙানো বা বিক্রির নামে অনিয়ম এবং সম্পদের বৈধ উৎস নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়।
‎
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তের দাবি জানানো হয়।

‎বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক লেনদেন, আয়কর ও করসংক্রান্ত নথিপত্র, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, সম্পদের বৈধ উৎস এবং অভিযোগকারী গ্রাহকদের বক্তব্য যাচাই করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
‎
‎তদন্তে কোনো অনিয়ম বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

‎সাত দফা দাবি উত্থাপন
‎সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
‎
দাবিগুলো হলো,১. গত ২২ অক্টোবর পাঁচ্চরের ঠাকুরবাজার এলাকার পূজামণ্ডপে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও লাঞ্ছনার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে হবে।

‎২. সাংবাদিকদের শারীরিকভাবে আঘাত করা এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
‎
৩. বাদল কর্মকারের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
‎
৪. সংশ্লিষ্ট পূজামণ্ডপে নির্ধারিত সময়ের পর কার্যক্রম পরিচালনা, ডিজে পার্টির আয়োজন ও মদ্যপানের অভিযোগ যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা জনসম্মুখে তুলে ধরতে হবে।
‎
৫. মা লক্ষ্মী জুয়েলার্সের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আর্থিক অনিয়ম, গ্রাহকদের সঙ্গে বিরোধ এবং সম্পদের বৈধ উৎসসংক্রান্ত অভিযোগ প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করতে হবে।

‎৬. সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাঁরা কোনো ধরনের ভয়ভীতি, হুমকি কিংবা বাধা ছাড়াই স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

‎৭. পুরো ঘটনার তদন্ত নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্তভাবে পরিচালনার জন্য প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
‎
সমাপনী বক্তব্যে অপূর্ব চৌধুরী জয় বলেন, সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেওয়ার মাধ্যম নয়। সত্য অনুসন্ধান, জনস্বার্থ রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের কথা তুলে ধরাই সাংবাদিকদের প্রধান দায়িত্ব। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিক হামলা, লাঞ্ছনা কিংবা হুমকির শিকার হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, বরং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
‎
তিনি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের প্রতি অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের আহ্বান জানান।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা