বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ মতামত মাতামুহুরী উপজেলা হবে মফস্বলের মানুষের এক স্বপ্নের উপশহর

মাতামুহুরী উপজেলা হবে মফস্বলের মানুষের এক স্বপ্নের উপশহর

ওমর ফারুক, মাতামুহরী উপজেলা প্রতিনিধি : মাতামুহুরী উপজেলা কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের মাতামুহুরী নদীবেষ্টিত সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত নতুন উপজেলা। এটি কক্সবাজারের দশম উপজেলা এবং দেশের ৪৯৬তম উপজেলা হিসেবে পরিচিত।

স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো (বিশেষ করে বিএনপি) চকরিয়ার ৭টি উপকূলীয় ইউনিয়ন (বদরখালী, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা, সাহারবিল, ভেওলা মানিকচর, ঢেমুশিয়া ও কোনাখালী) নিয়ে মাতামুহুরী সাংগঠনিক থানা/উপজেলা ঘোষণা করে। এর উদ্দেশ্য ছিল দলীয় কার্যক্রম সহজ করা এবং পূর্ণাঙ্গ উপজেলা গঠনের দাবি জোরদার করা। উপজেলা গঠনের প্রক্রিয়া অনুসারে ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কক্সবাজার-১ আসনের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ (বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে মাতামুহুরীকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা করার কথা বলেন। নির্বাচনের পর দ্রুত প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়। ১৩ জুন ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপজেলা ও থানার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

উপজেলার নামকরণ করা হয়েছে -মাতামুহুরী নদী থেকে। এই থানার সাতটি ইউনিয়নকে মাতামুহুরী নদী বেতুয়া বাজার এলাকায় পাহাড়ের মুখে দুই ভাগ হয়ে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে বেঁকে যায় এবং দুই প্রান্তই বদরখালী ও মহেশখালীর প্রান্তে সাগরের মিশে য়ায়। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪৬–২৮৭ কিমি । মারমা ভাষায় এর নাম “মামুরি জনশ্রুতি অনুসারে। পাহাড়ের বিভিন্ন স্থান থেকে জল চুইয়ে তৈরি হওয়ায় (মমতাময়ী) বা “মাতামুহুরী নামকরণ হয়েছে নদীটির।

ব্রিটিশ আমলে (১৮৮০ সালের দিকে) নদীর অববাহিকায় মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট ঘোষণা করা হয় (প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার একর)। নদীটি তখন কাঠ ও বাঁশ পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল। শতশত মানুষ এই পেশায় যুক্ত ছিল।

মাতামুহুরী উপজেলা নিয়ে সাবেক চেয়ারম্যান ও পূর্ব বড় ভেওলা,ইউনিয়ন বি এন পির সভাপতি আনোয়ারুল আরিফ দুলাল মিয়ার কাছে জানতে চাই- ১। মাতামুহুরি উপজেলা গঠনের দাবিকে আপনারা কীভাবে দেখছেন?

এর উত্তরে তিনি বলেন- আমি এটিকে সর্বপ্রথম প্রশাসনিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে আসার একটি সুযোগ হিসেবে দেখবো, দীর্ঘদিন বৃহৎ চকরিয়া উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের প্রশাসনিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নাগরিক সেবা পেতে দূরত্ব ও সময়ের যে সমস্যা ছিল, নতুন মাতামুহুরি উপজেলা সেটি কমাতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। তবে শুধু উপজেলা ঘোষণার অর্থই উন্নয়ন নয়- এরজন্য প্রয়োজন কার্যকর অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগব্যবস্থা ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসনিক কর্মকান্ড, এসব নিশ্চিত করলেই আসবে কাঙ্খিত সাফল্য “।

২য় প্রশ্ন: এটি কি দীর্ঘদিনের জনদাবির বাস্তব প্রতিফলন, নাকি এর পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনাও রয়েছে ?
উত্তরে তিনি বলেন-

আমার দৃষ্টিতে দুটিকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখা উচিত হবে না। কেননা, স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে মাতামুহুরি উপজেলা স্হাপনের বিষয়ে দীর্ঘদিনের জনদাবির কথা বারবার উল্লেখযোগ্যভাবেই দৃষ্টিগোচর হয়ে আসছিলো, পাশাপাশি অত্রাঞ্চলের ভৌগোলিক বৈচিত্রতা ও জনসংখ্যা অনুযায়ী নানাবিধ চাহিদার বাস্তবতার কথাও মাথায় রাখা জরুরী।

একই সঙ্গে এই উপজেলাটি অত্রাঞ্চলের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, জননন্দিত জননেতা, স্বপ্নদ্রষ্টা, চকরিয়া-পেকুয়া (১) আসনের বারবার নির্বাচিত সফল সংসদ সদস্য, বর্তমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী “জনাব সালাহ উদ্দিন আহমদ” এর অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও।

অন্যদিকে মাতামুহুরী উপজেলার অন্যতম ইউনিয়ন ভেওলা মানিকচরের বিএন পির সভাপতি ও ভেওলা মানিকচর উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক রোকন উদ্দিন মো: বাবর স্যারে কাছে প্রশ্ন ছিল- ১। নতুন উপজেলা মাতামুহুরি এলাকার সাধারণ মানুষ কী কী বাস্তব সুবিধা পাবেন বলে আপনি মনে করেন? বিশেষ করে প্রশাসনিক সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন আশা করছেন?

উত্তরে তিনি বলেন- মাতামুহুরী অঞ্চল একদিকে মাতামুহুরী নদী (মিষ্টি পানির উৎস) এবং অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত। এখানকার মানুষ মূলত কৃষি, মৎস্য ও লবণ চাষের সাথে যুক্ত। তবে পেশাগত বৈচিত্র্যের অভাবে এবং জেলা সদর থেকে দূরবর্তী হওয়ায় এতদিন তারা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব সালাহউদ্দিন আহমেদ এখানকার মানুষের দুর্গতি দেখে মাতামুহুরী উপজেলা গঠনের পরিকল্পনা নেন। এর ফলে প্রশাসনিক ও জনকল্যাণমূলক বহু অফিস স্থাপিত হচ্ছে এবং এলাকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। নতুন উপজেলা, অধিবাসীদের প্রত্যাশা বিপুল। সরকারের সীমাবদ্ধতা দেখতে হবে, চাহিদার তুলনায় সম্পদ অপ্রতুল। আমাদের আশা মাতামুহুরী বাসী উপজেলা বাস্তবায়নে সামগ্রিক কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা রাখবে। সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমিও সরকারের কাছে আশা রাখতে পারি মাতামুহুরীতে প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে গিয়ে একটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, ভাল মানের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং লবণ শিল্পের বিকাশ ঘটুক।
আয়তন ও জনসংখ্যা

আয়তন: প্রায় ১৪৩.০৮ থেকে ১৪৩.৮ বর্গকিলোমিটার ।জনসংখ্যা: ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুসারে সাতটি ইউনিয়নের মোট জনসংখ্যা ১,৬২,৭০২ জন। কিছু স্থানীয় প্রতিবেদনে প্রায় ২.৫–৩ লাখের কথা বলা হয় । মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ (প্রায় ৯৮.৩৭%)।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

উপজেলা নতুন গঠিত হওয়ায় সাম্প্রতিক পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান এখনও চুড়ান্ত হয়নি। তবে স্থানীয় সূত্র অনুসারে আনুমানিক চিত্র: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: প্রায় ৪৪টি। মাধ্যমিক/হাই স্কুল: প্রায় ১২টি (নিম্ন মাধ্যমিকসহ আরও কয়েকটি)।
কলেজ: অন্তত ১টি ডিগ্রি কলেজ (বদরখালী কলেজ উল্লেখযোগ্য)।
মাদ্রাসা: ফাজিল ১টি (বদরখালী এম এস ফাজিল মাদ্রাসা), কামিল ১টি, দাখিল প্রায় ১২টি, কওমি প্রায় ৬টি।

ইবতেদায়ী মাদ্রাসা: স্বতন্ত্রসহ প্রায় ৩টি। উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান: বদরখালী কলেজ, বদরখালী এম এস ফাজিল মাদ্রাসা, ভেওলা মানিকচর উচ্চ বিদ্যালয়, বহদ্দারকাটা উচ্চ বিদ্যালয়, কোনাখালী করিমিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ইত্যাদি।

মাতামুহুরি নদীকে কেন্দ্র করে কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ, বাজারব্যবস্থা ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সমন্বিত উন্নয়ন করা সম্ভব। উক্ত নদীর পানি ও সংযুক্ত ভূমির সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারলে, এই অঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদন বাড়বে, মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণ নিশ্চিত হবে, পাশাপাশি সঠিকভাবে নদী শাসন বাস্তবায়ন হলে, স্থানীয় বাজার যেমনটা উন্নতি করবে, একইভাবে কৃষিপণ্য, মৎস্যপণ্য সরাসরি বৃহত্তর বাজারে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও সহজ হবে। এতে মাতামুহুরি উপজেলা শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়, একটি নদীকেন্দ্রিক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠবে, এটাই আমি বিশ্বাস করি।

পরিশেষে বলতে চাই, নবগঠিত মাতামুহুরি উপজেলা হয়ে উঠোক নদী, কৃষি, মৎস্য, ব্যবসা ও মানুষের সম্ভাবনাকে একত্র করে একটি স্বনির্ভর জনপদের ভিত্তি।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা