শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ কুষ্টিয়ায় পদ্মার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি

কুষ্টিয়ায় পদ্মার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি

শরিফ মাহমুদ, কুষ্টিয়া : কুষ্টিয়া জেলার এলাকা ঘেসে পদ্মা নদীর অব্যাহত ভাঙনে নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে অসংখ্য ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও যোগাযোগের বিভিন্ন সড়ক বা রাস্তা।

উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের পদ্মা নদীর তীরবর্তী সীমান্তঘেঁষা উদয়নগর, আতারপাড়া ও ডিগ্রীরচর এলাকায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পদ্মার প্রবল স্রোতে ফসলি জমি, বসতবাড়ি, চলাচলের রাস্তা ও বৈদ্যুতিক খুঁটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

এতে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের অসংখ্য মানুষ।

এদিকে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে নদীভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। পদ্মার প্রবল স্রোতে একের পর এক ঘরবাড়ি ও বৈদ্যুতিক খুঁটি নদীতে ধসে পড়তে দেখা গেছে। পদ্মার অব্যাহত ভাঙনে ওই এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে পদ্মায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে নদী ভাঙনও শুরু হয়েছে। তবে এক সপ্তাহ ধরে নদীর স্রোত প্রবল আকার ধারণ করায় নদী ভাঙনও আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। তাদের অভিযোগ, রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আলাইপুর এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের ফলে পদ্মার স্রোতের চাপ দৌলতপুর অংশে বেড়েছে।

এতে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে বলে তাদের দাবি। নদী ভাঙনের শিকার ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রায় একমাস ধরে এলাকায় কমবেশি ভাঙন চললেও সাম্প্রতিক কয়েক দিনে নদীর স্রোত এতটাই তীব্র হয়েছে যে, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, চলাচলের রাস্তা ও বৈদ্যুতিক খুঁটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

এতে অনেকে বসতবাড়ি ও ফসলিজমিসহ সর্বস্ব হারিয়ে নি:স্ব হয়ে পড়েছে। অনেকে আবার খোলা আকাশের নীচেও রয়েছে। এর আগে গত জুলাই মাসে দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের মাজদিয়াড় ও কোলদিয়াড় এলাকায়ও ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দেয়।

মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদী ভাঙনে শতাধিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। নদীর তীব্র ভাঙনে ওই এলাকার অন্তত ৫শত বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরী ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে। উদয়নগর, আতারপাড়া ও ডিগ্রীরচরের বাসিন্দারা জানান, সীমান্তঘেঁষা দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল।

প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনে তাদের ঘরবাড়ি ও জমিজমা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পদ্মার পানি কমে গেলে আবার চর জেগে ওঠে এবং সেখানে চাষাবাদ শুরু করেন তারা। কিন্তু ভাঙনের কারণে প্রতিবছরই নতুন করে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারাতে হচ্ছে তাদের।

পদ্মার ভাঙনে গতবছর উদয়নগর বিজিবি ক্যাম্প বিলীন হয়েছে। নদীভাঙন প্রতিরোধে ক্যাম্পের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় জিও ব্যাগসহ নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরও তা রক্ষা করা যায়নি। একই সঙ্গে কয়েকশ বিঘা জমি ও অসংখ্য ঘরবাড়ি নদীতে তলিয়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল সরকার বলেন, উদয়নগর, আতারপাড়া ও ডিগ্রীরচর এলাকার বসতভিটা, চলাচলের রাস্তা, ফসলি জমি, বৈদ্যুতিক খুঁটি এমনকি সীমান্তের কিছু অংশও পদ্মার প্রবল স্রোতে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

এক সপ্তাহ ধরে ভাঙন চলছে, তবে আজ থেকে এর তীব্রতা অনেক বেড়েছে। নদীর স্রোত সবকিছু ভেঙে চুরে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, পার্শ্ববর্তী বাঘা উপজেলার আলাইপুরে বেড়িবাঁধ দেওয়ার কারণে পদ্মার পানির পুরো চাপ আমাদের উদয়নগর, আতারপাড়া ও ডিগ্রীরচর এলাকায় পড়ছে।

এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই আতারপাড়া, উদয়নগর ও ডিগ্রীরচর গ্রাম আর থাকবে না। চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান বলেন, পদ্মায় নতুন করে পানি প্রবেশ করায় প্রবল স্রোত সৃষ্টি হয়েছে।

এতে উদয়নগর, ডিগ্রীরচর ও আতারপাড়া এলাকার বাড়িঘর, ফসলি জমি এবং বৈদ্যুতিক খুঁটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে শুনেছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

এবিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ আগে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ফায়ার সার্ভিসের একটি টিমসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আমরা ওই এলাকায় বৈঠক করেছি।

সীমান্তঘেঁষা দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় সেখানে জরুরী ভিত্তিতে কাজ করা ততটা সহজ নয়। নতুন করে পদ্মায় পানি প্রবেশ করায় ভাঙনকবলিত এলাকায় শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা বলে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পদ্মার ভাঙনের বিষয়ে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসাউদ্দৌলা বলেন, আমি মাত্র দুই দিন হলো কুষ্টিয়ায় যোগ দিয়েছি। ভাঙনকবলিত এলাকা বা পানির পরিস্থিতি সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত অবগত নই।

অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বন্যার পানি ও ভাঙন পরিস্থিতি সম্পর্কে পরে জানানো হবে। ভূক্তভোগী স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পদ্মার ভাঙনে অচিরেই আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

তাই ভাঙন রোধে জরুরী ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং দুর্গম চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা