শ্রীমঙ্গল ফিরে জাহাঙ্গীর খান বাবু: দৈনিক জনতার গত ২৯ ও ৩০ জুন সংখ্যার প্রথম পাতায় প্রকাশিত দুই পর্বের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে শ্রীমঙ্গলের চা বাগানের লাখো শ্রমিকের অবর্ণনীয় জীবনসংগ্রাম, দৈনিক মাত্র ১৮৭ টাকার নামমাত্র মজুরি, দৈনিক ২২ কেজি পাতা উত্তোলনের অমানবিক টার্গেট, নূন্যতম চিকিৎসাসেবার তীব্র সংকট এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা নিয়তি-নির্ধারিত বঞ্চনার লোমহর্ষক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন দুটি প্রকাশের পর দেশজুড়ে সুশীল সমাজ, মানবাধিকার কর্মী এবং সাধারণ পাঠকমহলে তীব্র ক্ষোভ ও ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান নীতি হলো—যার বা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা সমালোচনা উত্থাপিত হয়েছে, তাদের বক্তব্যও সমান গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করা। সেই পেশাগত দায়বদ্ধতা ও সততা থেকেই প্রতিবেদনে উঠে আসা সুনির্দিষ্ট অনিয়মগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও চা বাগান পরিচালনাকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক মতামত জানতে একাধিক পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা করে দৈনিক জনতা।
এই লক্ষ্যে যোগাযোগ করা হয়েছিল বাংলাদেশীয় চা সংসদের (বিসিএস) সভাপতি কামরান টি. রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল ডা. কাজী মুজাফফর, শীর্ষস্থানীয় চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফিনলে টি-এর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা তাহসিন আহমেদ চৌধুরী, ডানকান গ্রুপের প্রতিনিধি মোস্তাফিজুর রহমান, ন্যাশনাল টি কোম্পানির (এনটিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল আহসান এবং চা শিল্পের অভিভাবক সংস্থা বাংলাদেশ চা বোর্ডের সচিব মমিনুর রহমানের সঙ্গে। তাদের অধিকাংশের ব্যক্তিগত ও doptorik হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে সুনির্দিষ্ট প্রশ্নমালা পাঠানো হলেও এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করা পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এই নীরবতা প্রকারান্তরে মাঠপর্যায়ের রূঢ় সত্যগুলোকেই যেন মৌনস্বীকৃতি দেয়।
ব্যতিক্রম হিসেবে ডানকান গ্রুপের প্রতিনিধি মোস্তাফিজুর রহমান প্রথমে প্রতিবেদনটির খোঁজখবর নেওয়ায় ধন্যবাদ জানান এবং লিখিত প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। তবে তার কাছে পাঠানো সেই অনুত্তরিত প্রশ্নটি ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও আইনি ভিত্তিসম্পন্ন: “দৈনিক মাত্র ১৮৭ টাকা মজুরি পাওয়ার জন্য একজন শ্রমিককে বাধ্যতামূলকভাবে ২২ কেজি চা পাতা তুলতে হয়। কিন্তু তীব্র খরা মৌসুমে কিংবা প্রাকৃতিক কারণে যখন গাছে পর্যাপ্ত পাতা থাকে না, তখন এই লক্ষ্য অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। লক্ষ্য পূরণ না হলে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি কর্তন বা জরিমানা করা কতটা শ্রম আইনসম্মত এবং মানবিক? এতে কি রাষ্ট্র নিশ্চিতকৃত ন্যূনতম জীবনধারণের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে না?”—এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তার কাছ থেকেও আর মেলেনি।
অন্যদিকে, দেশের চা শিল্পের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন ও তদারকির প্রধান আইনি দায়িত্ব যার কাঁধে, সেই বাংলাদেশ চা বোর্ডের সচিবের কাছেও সুনির্দিষ্ট বার্তা পাঠানো হলেও সেখান থেকেও সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রাখা হয়েছে। চা বোর্ডের নিজস্ব দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে গর্বের সাথে উল্লেখ রয়েছে যে, সংস্থাটি ‘চা আইন, ২০১৬’ অনুযায়ী পরিচালিত একটি সংবিধিবদ্ধ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। তাদের আইনি ম্যান্ডেট কেবল চা উৎপাদন বৃদ্ধি বা বাজার সম্প্রসারণ নয়; বরং চা শিল্পের সার্বিক সুশাসন নিশ্চিত করা, বাগান পুনর্বাসন এবং চা সংশ্লিষ্ট জনবলের কল্যাণ সাধন করাও তাদের আইনি ও নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জোরালো আইনি প্রশ্ন উঠেছে—মাঠপর্যায়ে যখন হাজার হাজার শ্রমিক লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ করছেন যে তারা সরকার নির্ধারিত নূন্যতম সুবিধা পাচ্ছেন না, তাদের চিকিৎসাসেবা চরমভাবে সীমিত, আবাসন ব্যবস্থা অস্বাস্থ্যকর ও পশুতুল্য এবং তাদের ওপর খরা মৌসুমেও অতিরিক্ত উৎপাদনের বেআইনি চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তখন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ চা বোর্ড কেন এই প্রকাশ্য দাসত্ব প্রথাকে নীরব দর্শক হয়ে প্রশ্রয় দিচ্ছে? আইন বাস্তবায়নে এই চরম উদাসীনতা কি প্রকারান্তরে প্রভাবশালী বাগান মালিকদের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে না?
অনুসন্ধানে যেসব অধিকারবঞ্চিত শ্রমিকের সাথে কথা হয়েছে, তাদের কেউই কোনো বিলাসী বা অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধার দাবি করেননি। তাদের আকুতি অত্যন্ত সাধারণ ও মৌলিক—কাজের ন্যায্য মূল্য বা বাঁচার মতো মজুরি, অন্তত বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, একটি মাথা গোঁজার মতো নিরাপদ বাসস্থান এবং একজন স্বাধীন নাগরিক হিসেবে সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ। চা শিল্পের মালিকপক্ষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই সম্মিলিত নীরবতা প্রমাণ করে যে, এই বঞ্চনার শিকড় অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত এবং তা ভাঙার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা নেই।
চা শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়কারী গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু যে লাখো শ্রমিকের হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘামের ওপর ভর করে এই বিশাল শিল্প দাঁড়িয়ে আছে, তাদের এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বঞ্চনাকে এভাবে চেপে রাখা হলে তা ভবিষ্যতে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ খাতের জন্য এক আত্মঘাতী ও অপূরণীয় সংকটের জন্ম দেবে। মালিকপক্ষ ও চা বোর্ডের বর্তমান নীরবতা অপরাধ ঢাকবার চেষ্টা হতে পারে, কিন্তু তা ইতিহাসের দরবারে এই নির্মম শোষণকে কখনো আড়াল করতে পারবে না।
