বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ মতামত স্বপ্ন যখন হার মানায় দারিদ্র্যকে: নজরুল ইসলাম বাচ্চুর জীবনসংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প

স্বপ্ন যখন হার মানায় দারিদ্র্যকে: নজরুল ইসলাম বাচ্চুর জীবনসংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প

মোঃ আবদুল মান্নান: মানুষের জীবনে সাফল্য কখনোই আকস্মিকভাবে আসে না। প্রতিটি সাফল্যের পেছনে থাকে অগণিত নির্ঘুম রাত, অসংখ্য ব্যর্থতার বেদনা, সীমাহীন ত্যাগ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি। যে মানুষ প্রতিকূলতাকে পরাজিত করে নিজের ভাগ্য নিজেই লিখতে পারেন, তার জীবনই হয়ে ওঠে অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার এক জীবন্ত পাঠশালা। এমনই একজন সংগ্রামী ও সফল মানুষ জনাব নজরুল ইসলাম বাচ্চু। আজ যিনি যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত একজন সফল ব্যবসায়ী, একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা এবং সমাজসেবক হিসেবে পরিচিত, তার জীবন কিন্তু শুরু হয়েছিল একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতা থেকে। অভাব, অনিশ্চয়তা আর কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তাকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। মাত্র ষোলো বছর বয়সে বাবাকে হারান নজরুল ইসলাম বাচ্চু। পরিবারের ওপর নেমে আসে কঠিন আর্থিক সংকট। অনেকের জীবন যেখানে এমন পরিস্থিতিতে থেমে যায়, সেখানে তিনি সংকটকে পরাজিত করার সংকল্প নেন। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেই চালিয়ে যান পড়াশোনা। অভাব কখনো তার স্বপ্নকে ছোট করতে পারেনি; বরং প্রতিটি কষ্ট তাকে আরও দৃঢ় করেছে। নাগরপুর সরকারি কলেজ থেকে ১৯৮৬ সালে বিএসসি পাস করার পর জীবিকার সন্ধানে তিনি ঢাকায় পাড়ি জমান। রাজধানীর চাকচিক্যময় জীবনের আড়ালে তখন তার বাস্তবতা ছিল অত্যন্ত কঠিন। মাত্র ১৫০ টাকা সিটভাড়া দিয়ে তালাই ও বাঁশের বেড়ার একটি ছোট্ট ঘরে আশ্রয় নেন। জীবন তখন প্রতিদিনই ছিল টিকে থাকার লড়াই। সংসার চালাতে শুরু করেন টিউশনি। দিনের একাংশ কাটত শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে, আর বাকি সময় হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজে বেড়াতেন। দীর্ঘ চেষ্টা ও ধৈর্যের পর অবশেষে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাভার ট্রেনিং স্কুলে শিক্ষক হিসেবে একটি চাকরি পান। বেতন ছিল অল্প, কিন্তু সেই সামান্য আয়ই ছিল তার নতুন জীবনের ভিত্তি। সীমিত আয়েও তিনি কখনো হতাশ হননি। কারণ তিনি জানতেন, প্রতিটি ছোট পদক্ষেপই একদিন বড় গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। জীবনের মোড় ঘুরে যায় এক অপ্রত্যাশিত ঘটনায়। একদিন তার বাল্যবন্ধু গয়হাটা পূর্বপাড়ার মোশলেম সাভারে তার সঙ্গে দেখা করতে যান। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের ডাইভারসিটি ভিসা বা অপি-১ ওয়ান কর্মসূচির আবেদন চলছিল। রাস্তা থেকে দশ টাকা দিয়ে দুটি আবেদনপত্র কিনে আনেন মোশলেম। কাছের একটি কম্পিউটারের দোকানে বসে দুই বন্ধু আবেদনপত্র পূরণ করে জমা দেন। তখন হয়তো তারা কেউই ভাবতে পারেননি, এই সামান্য ঘটনাই একদিন বদলে দেবে একজন মানুষের পুরো জীবন। কয়েক সপ্তাহ পর আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রথম চিঠি। এরপর দ্বিতীয় চিঠি। ধীরে ধীরে নিশ্চিত হয় নতুন জীবনের সম্ভাবনা। ভাগ্যের নতুন দুয়ার খুলে যায়। কিন্তু বিদেশে যাওয়াও সহজ ছিল না। সেই স্বপ্নপূরণের জন্য বিক্রি করতে হয় পৈতৃক ভিটেমাটি। ধারদেনা করতে হয় আত্মীয়-স্বজনের কাছে। সবকিছু মিলিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েই তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসে। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, নতুন ভাষা—সবকিছুই ছিল অচেনা। শুরুটা ছিল অত্যন্ত কঠিন। জীবনের প্রথম কয়েক বছর তাকে নানা ধরনের কষ্ট ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু তিনি হার মানেননি। কঠোর পরিশ্রম, সততা, অধ্যবসায় এবং দূরদর্শিতাকে পুঁজি করে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান গড়ে তোলেন। একসময় তিনি উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। গড়ে তোলেন একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ধাপে ধাপে অর্জন করেন আর্থিক সাফল্য ও সামাজিক মর্যাদা। আজ তিনি শত শত কোটি টাকার সম্পদের অধিকারী বলে পরিচিত। তবে তার প্রকৃত পরিচয় কেবল একজন সফল ব্যবসায়ী নয়; তিনি একজন সংগ্রামী মানুষ, যিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন—স্বপ্ন দেখতে জানতে হয়, আর সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে পরিশ্রমের বিকল্প নেই। অর্থ ও প্রতিষ্ঠা অনেক মানুষকেই বদলে দেয়। কিন্তু নজরুল ইসলাম বাচ্চুর ক্ষেত্রে বিষয়টি যেন উল্টো। জীবনের কঠিন দিনগুলোর স্মৃতি তিনি কখনো ভুলে যাননি। ভুলে যাননি নিজের শিকড়, আত্মীয়স্বজন কিংবা শৈশবের বন্ধুদের। সময় পেলেই তিনি ফিরে আসেন গ্রামের বাড়িতে। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে বসে আড্ডা দেন, খোঁজ নেন পরিচিত মানুষদের। গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক আজও আগের মতোই আন্তরিক। এই সহজ-সরল আচরণই তাকে মানুষের আরও কাছের মানুষ করে তুলেছে। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এলাকার অসহায়, দরিদ্র ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি দায়িত্ব মনে করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, মসজিদ-মাদ্রাসার সহযোগিতা এবং নানা সামাজিক ও মানবিক কাজে তার অবদান স্থানীয় মানুষের কাছে প্রশংসিত। সমাজের প্রতি এই দায়বদ্ধতাই একজন সফল মানুষের প্রকৃত পরিচয় বহন করে। গ্রামের মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন ধনী ব্যক্তি নন; তিনি একজন ভালো মানুষ। তার বিনয়, উদারতা এবং মানবিক আচরণের জন্য এলাকায় রয়েছে বিশেষ সুনাম। অর্থবিত্তের অহংকার তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। বরং যতই প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, ততই মানুষের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করেছেন। নজরুল ইসলাম বাচ্চুর জীবন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—জন্ম নয়, মানুষের পরিচয় তৈরি হয় তার কর্মে। দারিদ্র্য কখনো মানুষের স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারে না, যদি সেই মানুষটি নিজের লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থাকেন। ছোট একটি গ্রামের এক সংগ্রামী তরুণ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প তাই শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্যের ইতিহাস নয়; এটি সাহস, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসের এক অনন্য দলিল। আজকের তরুণ প্রজন্ম যখন দ্রুত সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তখন নজরুল ইসলাম বাচ্চুর জীবন তাদের শেখায়—সাফল্যের কোনো শর্টকাট নেই। ধৈর্য, কঠোর পরিশ্রম, সততা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসাই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে বড় করে তোলে। আমাদের প্রত্যাশা, তিনি ভবিষ্যতেও তার মানবিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখবেন। সমাজকল্যাণে তার অবদান আরও বিস্তৃত হবে। তার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং অব্যাহত সাফল্য কামনা করি। কারণ, এমন মানুষের গল্প যত বেশি ছড়িয়ে পড়বে, তত বেশি মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখবে এবং বিশ্বাস করবে—সংগ্রাম কখনো বৃথা যায় না।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা