স্টাফ রিপোর্টার: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় রাজধানীর ডেমরার ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডি নির্বাচন-২০২৬ স্থগিত ঘোষণা করেছে ঢাকা জেলা প্রশাসন। শনিবার এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শুক্রবার রাতে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শামীমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক জরুরি নোটিশে এই স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। এর পর পরই বিএনপি-জামায়াত ও অভিভাবকদের মধ্যে একধরনের অপ্রীতিকর বাক্য বিনিময় শুরু হয়। একে অপরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেন। সর্বশেষ শনিবার দিনভর শুরু হয় পাল্টা-পাল্টি বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল। এ সময় প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লার পদত্যাগ দাবি করেন বিক্ষোভ কারিদের একাংশ। একইসঙ্গে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত অনিদিস্ট কালের জন্য স্কুল কলেজ বন্ধ থাকবে বলে হুসিয়ারি দিয়েছেন। তবে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুন্দর, মার্জিত ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে বরাবরের মতো অভিভাবকরা অধ্যক্ষ ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এদিন বিকালে স্থগিত হওয়া নির্বাচন পুনরায় ঘোষণা দাবিতে ভোটার ও প্রার্থীদের নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন মাধ্যমিক শাখার প্রার্থী সরোয়ার আরিফ উদ্দিন। এরআগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিভাবকদের একটি বার্তা দিয়েছেন সারোয়ার আরিফ উদ্দিন। বার্তায় তিনি উল্লেখ করেছেন, শনিবার দেশসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ এর অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচন শুক্রবার রাত প্রায় ১১টার দিকে অনিবার্য কারণবশত স্থগিত করা হয়েছে। যেহেতু গভীর রাতে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে, তাই প্রিয় অভিভাবকদের জানাতে পারিনি, এরজন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমার প্রিয় অভিভাবকগণ আপনারা সকলে এই নির্বাচনে যে আন্তরিকতা ও ভালোবাসা নিয়ে আমার পাশে থেকেছেন, আমাকে সর্বসময় সুন্দর পরামর্শ দিয়েছেন এবং নির্বাচনের মাঠে আমার জন্য কাদাপানি-বৃষ্টির মধ্যেও ভোট চেয়েছেন,পরিশ্রম করেছেন, তার জন্য চিরজীবন আমি কৃতজ্ঞ থাকবো। তবে নির্বাচন সাময়িকভাবে স্থগিত হলেও আশাকরি সহসাই অভিভাবকদের সকল দাবি পুরন করার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২৫ জুলাই সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচনে ভোট গ্রহন হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্ব স্ব প্রতীকের প্রার্থীরাও আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনে অংশ গ্রহন করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী এবং অভিভাবকদের একটি অংশের আন্দোলনের মুখে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরআগে সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে পরপর তিনটি ককটেল বিস্ফোরণ এবং তিন রাউন্ড গুলির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। একইসঙ্গে শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে প্রায় ২ থেকে ৩ শ বিএনপির নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে জড়ো হন। তারা অভিভাবকদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে নির্বাচন স্থগিতের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। আন্দোলনকারীরা দুই ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচন স্থগিতের আল্টিমেটাম দেন। তবে ককটেল বিস্ফোরণ, গুলির ঘটনা এবং নির্বাচন স্থগিতের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে নির্বাচন স্থগিতের নোটিশ পাওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার বিকাল পর্যন্ত নির্বাচন বন্ধের পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় অধিবাসীদের পাল্টাপাল্টি স্লোগান ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে দেখা গেছে। অভিভাবকরা বলছেন, সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজকে একটি দেশসেরা ও ঐতিহ্যবাহী কলেজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এখানে অত্যন্ত সুন্দর, মার্জিত ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে ভদ্রলোকের সন্তানরা পড়াশোনা করে আসছে। আসন্ন গভর্নিং বডি নির্বাচন-২০২৬-কে কেন্দ্র করে অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে সম্মানিত, শিক্ষিত ও রুচিশীল অভিভাবকরা প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করছেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সুখ্যাতি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছে ডেমরা-যাত্রাবাড়ী এলাকার চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা। এই চক্রটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির নির্বাচন বানচাল করার জন্য হীন ও মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নবী উল্লাহ নবী ও তার মেয়ের জামাই রনির অশুভ চোখ পড়েছে অত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে। তাদের অভিযোগ, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি বড় দলের দলীয় মনোনয়ন পাওয়া সত্ত্বেও নবী উল্লাহ নবী এবং তার মেয়ে জামাই রনির চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও নানা ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান ও বয়কট করেছিল। এখন সেই চিহ্নিত চাঁদাবাজ রনি সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতি পদ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য এলাকার কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের মাঠে নামিয়েছে। সভাপতি পদের লোভে সন্ত্রাসী রনি ও তার সহযোগীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সম্মানিত প্রার্থীদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে চলেছে এবং হুমকি প্রদান করছে। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানের সুনাম বিনষ্টকারী ও মাদকসেবীদের আশ্রয়দাতা এই চক্রটি ‘তুরান গ্রুপ’-এর সহায়তায় ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে। একইসঙ্গে শুক্রবার রাতে এরা ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণ করে এক ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। শিক্ষাঙ্গনের জন্য চরম নিন্দনীয় ও জঘন্যতম অপরাধের জন্য তাদের শাস্তিও দাবি করেছেন অভিভাবকরা। অভিভাবকদের দেয়া একই বক্তব্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভায়রাল হতে দেখা গেছে। এরআগে ডেমরা শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচনে কিছু বিষয় নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব নবী উল্লাহ্ নবী। তিনি অভিযোগ করেন, একটি নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে জামায়াতের এমপি কামাল হোসেন এবং কলেজের অধ্যক্ষকে সাথে নিয়ে একসঙ্গে অভিভাবকদের কাছে ভোট প্রার্থনা করছেন। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও আচরণবিধি নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন অবশ্যই সকল প্রার্থীর জন্য সমান ও নিরপেক্ষ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাব বলয়ের কেন্দ্র হতে পারে না। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক এবং এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক, যাতে প্রতিটি অভিভাবক স্বাধীন ও নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা, নিরপেক্ষতা ও সুষ্ঠু নির্বাচন রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।
আন্দোলনকারীরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নিজের অনুসারীদের নিয়ে একটি ‘সাজানো নির্বাচন’ আয়োজনের চক্রান্ত করছিলেন। অধ্যক্ষ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে একাধিক মামলার আসামি। এ সময় ‘চেয়ার’ প্রতীকের প্রার্থী মো. শাহজাহান খান অভিযোগ করে বলেন, অধ্যক্ষ চক্রান্ত করে এই নির্বাচন স্থগিত করিয়েছেন। তিনি জানেন নির্বাচিত কমিটি দায়িত্ব নিলে তার অনিয়ম, মানি রসিদ ছাড়া অর্থ লেনদেন ও লুটপাট বন্ধ হয়ে যাবে। সেই ভয়েই তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে নির্বাচন পণ্ড করেছেন। তবে বেশ কয়েকজন প্রার্থীরা দাবি করেন, নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং অভিভাবকরা প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তারাও অধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবি করে দ্রুত নতুন করে সুষ্ঠু নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার দাবি জানান। তবে উত্থাপিত অভিযোগ ও নির্বাচন স্থগিত সংক্রান্ত বিষয়ে সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লার কোনো বক্তব্যে পাওয়া যায় নি।
প্রসঙ্গত, সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজে মোট ভোটারের সংখ্যা-১৬৮৬৪ জন। এরমধ্যে প্রাথমিকে মোট ভোটারের সংখ্যা-৬৬২৮ জন, মাধ্যমিকে ভোটার সংখ্যা-৯১৭০ জন এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ভোটারের সংখ্যা-১০৬৬ জন।
