মোঃ আবু সাঈদ : সম্প্রতি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের তিন দিনের ঢাকা সফর বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই প্রভাবশালী কূটনীতিবিদ এমন এক সময়ে বাংলাদেশ সফর করলেন, যখন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এক জটিল মোড় নিচ্ছে। সফরে বাংলাদেশের শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে সার্জিও গোরের বৈঠক এবং সফর ঘিরে তৈরি হওয়া নানা কূটনৈতিক চর্চা এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রূপ নিয়েছে।
বাইরের দৃষ্টিতে বৈঠকগুলোকে ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ’ ও ‘ফলপ্রসূ’ আখ্যা দেওয়া হলেও পর্দার আড়ালে শক্তিধর দেশগুলোর সমীকরণ ও কৌশলের অবস্থান কতটা জটিল, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
সার্জিও গোরের সফরে একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা দৃশ্যমান হয়েছে। একদিকে মার্কিন বিশেষ দূত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। অন্যদিকে, ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে তার পৃথক আলোচনায় ত্রিদেশীয় সম্পর্কের নতুন এক মাত্রার আভাস পাওয়া গেছে।
ভারতের মার্কিন রাষ্ট্রদূত ঢাকায় এসে ভারতীয় ঢাকায় নিযুক্ত হাইকমিশনারের সাথে বৈঠক করা বা পরস্পরের সাথে নিবিড় বার্তা বিনিময় আঞ্চলিক রাজনীতিতে দিল্লির ভূমিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সমন্বয়ের বার্তা দেয়। তবে একই সময়ে বাংলাদেশ সরকারের আয়োজিত নৈশভোজে মার্কিন বিশেষ দূতের অনুপস্থিতি কিংবা সফরসূচির নির্ধারিত পরিবর্তনগুলো কূটনৈতিক ভাষায় বিশেষ সংকেত বহন করে। কূটনৈতিক শিষ্টাচারে আনুষ্ঠানিক ভোজ বা সেশনে উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়; বরং এর পেছনে থাকে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও নীতিগত বার্তা।
আমেরিকার এ সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ‘প্যাক্স সিলিকা’ (Pax Silica) জোটে টানার প্রস্তাব। এই উদ্যোগ মূলত ক্রিটিক্যাল মিনারেলস, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য মোকাবিলার লক্ষ্যে তৈরি।
বাংলাদেশ সম্প্রতি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোগত সংযোগ জোরদার করায় ওয়াশিংটন তাদের উদ্বেগের কথা স্পষ্ট করেছে। বিশেষ করে চীনের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্প এবং গভীর সমুদ্রবন্দর কেন্দ্রিক আঞ্চলিক সংযোগ ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ফলে সার্জিও গোরের এই বার্তা খুবই পরিষ্কার: যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশ যেন তথ্যপ্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং অবকাঠামো খাতে বেইজিংয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে মার্কিন বা মিত্র জোটের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়।
ঢাকা-দিল্লি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যখন নানা প্রশ্নে শীতলতার মুখোমুখি, তখন ভারতের কূটনীতিকদের সাথে মার্কিন দূতের ঢাকার মাটিতে এই দৌড়ঝাঁপ বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকদের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। বিরোধীদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই বৈঠকগুলোকে ঢাকার বদলে দিল্লিতে হওয়াই ‘স্বাভাবিক’ ছিল বলে যে মন্তব্যগুলো আসছে, তা মূলত বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটন ও দিল্লির যৌথ প্রভাব বিস্তারের কৌশলকেই নির্দেশ করে।
আমেরিকা দক্ষিণ এশীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবেই ভারতকে তাদের প্রধান অংশীদার মনে করে। কিন্তু বাংলাদেশ যদি সরাসরি আমেরিকার নিরাপত্তা বলয়ে না গিয়ে চীন বা স্বাধীন ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে চায়, তবে ভারত ও আমেরিকা—উভয় পরাশক্তিই যৌথভাবে অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করতে পারে।
একই সঙ্গে, বিরোধী রাজনৈতিক শিবির বা বিগত সরকারের বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতাদের সাথে মার্কিন দূতের আলোচনার গুঞ্জন কিংবা যোগাযোগ অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। এটি নির্দেশ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র কেবল বর্তমান সরকারের সাথেই নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অতীত ও ভবিষ্যৎ অংশীদারদের সঙ্গেও একটি কার্যকর চ্যানেল বজায় রাখতে ইচ্ছুক।
বর্তমান সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায় বা রূপান্তরকালীন সময়ে রেখে যাওয়া অস্থিতিশীল কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। বাংলাদেশের জন্য বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেকোনো একপক্ষে ঝুঁকে পড়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশকে একদিকে মার্কিন বিনিয়োগের দরজা খোলা রাখতে হবে। কৃষি (যেমন সয়াবিন, তুলা, গম आयात) ও আইটি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যেমন জরুরি, তেমনি অন্যদিকে সস্তা ঋণ, প্রযুক্তি এবং কাঁচামালের জন্য চীনা অর্থনীতির ওপর বাংলাদেশ এখনো অত্যন্ত নির্ভরশীল। ভারত ও আমেরিকার চাপের মুখে চীনা প্রকল্প বাতিল করা বা পিছিয়ে দেওয়া বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এবং প্রবৃদ্ধির গতিকে থমকে দিতে পারে।
সার্জিও গোরের সফরটি কোনো সাধারণ কূটনৈতিক সৌজন্য সফর ছিল না; বরং এটি ছিল বাংলাদেশকে বড় শক্তির লড়াইয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক আহ্বান। যদি বর্তমান সরকার আমেরিকা ও ভারতকে অতিরিক্ত তুষ্ট করতে গিয়ে চীনের তীব্র অসন্তোষের মুখে পড়ে, তবে তা এশীয় অর্থনৈতিক বাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। আবার চীনকে বাড়তি প্রাধান্য দিলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্য সুবিধার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
আমি মনে করি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত “সবার সাথে বন্ধুত্ব” নীতির বাস্তবিক ও বুদ্ধিভিত্তিক প্রয়োগ। কেবল একটি পরাশক্তির বলয়ে না ঢুকে বাংলাদেশ যদি নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তবেই বঙ্গোপসাগরের এই ভূ-রাজনৈতিক চালের বোর্ড থেকে ‘চেকমেট’ না হয়ে নিরাপদ উত্তরণ সম্ভব। অন্যথায়, বড় বড় শক্তির পদচারণায় অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা উভয়ই এক দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে পারে।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। abusayed.sdream@gmail.com
