ক্স বিভাগজুড়ে অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক ২৮০
ক্স লাইসেন্স নবায়ন, মানসম্মত পরিবেশ এবং দক্ষ জনবল ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে
ক্স নেই দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স বা ল্যাব টেকনিশিয়ান
ক্স স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে চলছে জমজমাট ব্যবসা
বি এম রাকিব হাসান, খুলনা : সকল প্রকার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বাণিজ্য। স্বাস্থ্য বিভাগের সঠিক তদারকি ও অনুমোদন ছাড়াই ব্যাঙের ছাতার মতো অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। লাইসেন্স নবায়ন, মানসম্মত পরিবেশ এবং দক্ষ জনবল ছাড়াই পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানের কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বেশিরভাগ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ও দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স বা ল্যাব টেকনিশিয়ান থাকে না। অপেশাদার ব্যক্তিদের দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর ফলে প্রায়ই ভুল রোগ নির্ণয় হয়। এতে রোগীর জীবন বিপন্ন হয়। সরকারি নিয়মকে তোয়াক্কা করে সাধারণ রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় করা হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানের সামনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নাম লেখা থাকলেও বাস্তবে কোনো দক্ষ বা স্থায়ী ডাক্তার থাকে না।
খুলনা বিভাগে বর্তমানে ৮৯৭টি ক্লিনিক ও ১ হাজার ৪১৬টি ডায়াগণস্টিক সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে ১১২টি ক্লিনিক ও ১৬৮টি ডায়াগণস্টিক সেন্টারের কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। অর্থাৎ মোট ২৮০টি প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুমোদন ছাড়াই চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে।
সূত্রমতে, সকল প্রকার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বাণিজ্য। চিকিৎসার নামে চলছে ভয়াবহ প্রতারণা। বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে রোগীদের ভুল বুঝিয়ে এবং প্রলোভন দেখিয়ে বাণিজ্য চলছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে কমিশন পাচ্ছে দালাল চক্র। তবে এ দালাল চক্রের বিরুদ্ধে র্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশ মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করলেও তারা থেমে নেই। কতিপয় দালালকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হলেও জামিনে বের হয়ে আবারও একই কাজে নেমে যায়। এসব দালাল নিয়ন্ত্রণকারী বেসরকারি লাইসেন্স বিহীন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে।
নীতিমালার শর্তানুযায়ী ডাক্তার নার্স-প্যাথলজিক্যাল লাইসেন্স কিংবা নবায়ন না করেই স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে চলছে জমজমাট ব্যবসা। বিধি অনুযায়ী প্রতিটি ১০ শয্যা ক্লিনিকের জন্য নির্ধারিত ৩ জন ডাক্তার, ডিপ্লোমাধারী ২ জন নার্স ও ৩ জন সুইপার থাকা বাঞ্ছনীয়। একই সাথে ৮শ’ বর্গফুট জায়গা, সার্বক্ষণিক একজন ডাক্তার, নার্স ও সুইপার থাকতে হবে। অন্যদিকে প্যাথলজি বিভাগ চালু করতে হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ডিপ্লোমাধারী প্যাথলজিস্ট ও ১ জন সুইপার রাখার বিধান। আর মাইক্রোস্কোপ, ফ্রিজ, মেডিকেল যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটার ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অথচ অধিকাংশ ক্লিনিকে নির্ধারিত ডাক্তার নেই। তারা চুক্তি অনুযায়ী ডাক্তার ডেকে রোগীর অপারেশন বা অন্যান্য চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। তাছাড়া সব ডাক্তাররা একাধিক ক্লিনিকে চুক্তিবদ্ধ। তাই ঠিকমত সেবাও দিতে পারেন না। রোগীদের সঙ্কটকালীন সময়ে ডাক্তার পাওয়া যায় না। অনেকে ক্লিনিক ব্যবসার সাথে ডায়াগনস্টিক ব্যবসা জমজমাট করে তুলেছেন। এ ক্ষেত্রে নিয়ম নীতি মানা হচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের হয়রানির শেষ নেই।
রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, অবৈধ অনেক ক্লিনিকেই রোগীরা ভুল চিকিৎসার শিকার হচ্ছেন। এমনকি রোগীর মৃত্যুও হচ্ছে। কিছু কিছু ক্লিনিক রোগীদের কাছ থেকে বাড়তি বিল আদায় করছে। নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের একাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ। এতে একদিকে বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি, অন্যদিকে নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ায় রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। কিন্তু এ বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন দপ্তরের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুলনা নগরীর মধ্যে ২৯৬টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের অনুমোদন রয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় (পরিচালক) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ১০ জেলার মধ্যে সাতক্ষীরা ও যশোরে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সাতক্ষীরায় ৩২টি ক্লিনিক ও ৫২টি ডায়াগণস্টিক সেন্টার লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে। যশোরে রয়েছে ৪৩টি ক্লিনিক ও ২৯টি ডায়াগণস্টিক সেন্টার। এ ছাড়া মাগুরায় ১১টি ক্লিনিক ও ২১টি ডায়াগণস্টিক সেন্টার, কুষ্টিয়ায় ৫টি ক্লিনিক ও ২৫টি ডায়াগণস্টিক সেন্টার, বাগেরহাটে ২টি ক্লিনিক ও ৭টি ডায়াগণস্টিক সেন্টার এবং মেহেরপুরে ২টি ক্লিনিক ও ৪টি ডায়াগণস্টিক সেন্টার লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। নড়াইলে ২টি ক্লিনিক এবং ঝিনাইদহে ৩টি লাইসেন্সবিহীন ডায়াগণস্টিক সেন্টারের তথ্য পাওয়া গেছে। চুয়াডাঙ্গায় লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠান না থাকলেও বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৪টি ক্লিনিক ও একটি ডায়াগণস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে বন্ধের জন্য পত্র জারি করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ইতোমধ্যে ২৯টি ক্লিনিক ও ৩৯টি ডায়াগণস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে বন্ধের জন্য নোটিশ জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৪২টি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বন্ধ রয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ মোশারেফ হোসেন বলেন, আমি সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই বিভাগজুড়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। জনস্বার্থে স্বাস্থ্য বিভাগকে ঢেলে সাজানোর কাজ চলছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন সোসাইটির বিভাগীয় মাহসচিব মো: আজগর হোসেন বলেন, লাইসেন্স ছাড়াই ব্যাঙের ছাতার মতো ক্লিনিক ও প্যাথলজি গড়ে উঠেছে। প্রতিটি ক্লিনিকের সামনে সাইনবোর্ডে অসংখ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নাম লেখা থাকে। তাদের অনেকেই ওই প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত যায় না। অনেক ক্লিনিকেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক নার্স, দক্ষ টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য জনবল নেই। যন্ত্রপাতির সংকট রয়েছে, পরিবেশও নোংরা। কখনো কখনো সার্বক্ষণিক চিকিৎসকও থাকে না। তারা অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং অনুমোদিত সকল প্রতিষ্ঠানকে শৃঙ্খলার আওতায় আনার দাবি জানান।
