গোলজার হোসেন, রংপুর : রংপুর নগরীর কামাল কাছনার মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যাকাণ্ডের ঘটনার গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ হত্যার মোটিভ এখনো জানতে পারেনি। হত্যার দায়ে গ্রেফতার দুই আসামির ডিএনএ এর নমুনা এখনো পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়নি। হত্যার শিকার চক্রবর্তী পরিবারের ৪ জনের ভিসেরা রিপোর্টের সেম্পল ঘটনার ১২ দিন পর পাঠানো হয়েছে। তদন্ত সংস্থার অনেক বক্তব্য বিভ্রান্তিকর হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মামলার তদন্তে প্রকৃত হত্যাকারীর মুখোশ উন্মোচন হবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
এদিকে রংপুরে সফরে এসে এই হত্যার ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি বিষয়ে কথা বলেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। তিনি বলেন, এই হত্যার ঘটনাকে আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা রয়েছে। তদন্তে হয়তো বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ তৈরি হচ্ছে, তাই একটু সময় লাগছে।
তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এত বড় একটি হত্যাকাণ্ড এর আগে রংপুর শহরে ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। হয়তো সে কারণে তদন্ত সংস্থা সময় নিচ্ছে। আশা করি, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে একটি চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হবে এবং দ্রুততম সময়ে বিচারকার্য শেষ করা যাবে।
এই মামলার মোটিভ ও তদন্ত নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই নানান পরস্পরবিরোধী বক্তব্য মিডিয়ায় তুলে ধরা হয়েছে। যা হত্যার ঘটনা প্রবাহের সাথে মিলছে না। ময়না তদন্ত রিপোর্ট, পুলিশের বক্তব্য, সিআইডি টিমের হত্যার আলামত সংগ্রহ প্রক্রিয়া সব কিছুতেই যেন য়সারাভাব লক্ষ্য করা গেছে। তাই এর নেপথ্যে অন্য কিছু লুকিয়ে আছে কিনা তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন এই হত্যা রহস্য উদঘাটনের জন্য।
তদন্ত সংস্থা গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই বলা হচ্ছিল গ্রেফতার দু’জনেই হত্যার সাথে জড়িত। ৯টি ইয়াবা সেবনের পরে তারা নেশাগ্রস্থ অবস্থায় হত্যার করে পর্যায়ক্রমে ৪জনকে। এই বক্তব্য থেকে এখন সরে এসে গোয়েন্দা পুলিশ এখন মরিয়া হয়ে খুঁজছে হত্যার সাথে আরও কেউ জড়িত আছে এবং এই হত্যার ছকের পরীকল্পনা দীর্ঘদিনের।
পুলিশ কমিশনার প্রথম বক্তব্য:
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ ২৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, আসামিরা ইয়াবা সেবনের জন্য গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠার পর ভোরে তাদের দেখে ফেলেন শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে প্রথমে তাকে এবং পরে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে হত্যা করা হয়। পরে ঘটনাটিকে চুরি বা ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে স্বর্ণালংকার ও টাকা নিয়ে যায় তারা। তারা ৯টি ইয়াবা সেবন করেছিল। তাই নেশাগ্রস্থ থাকায় এই খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে গ্রেফতার দু’জন সিদ্ধার্থ দাস(২২) ও মুগ্ধ দাস(২৪)।
ময়নাতদন্তে ৪জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধ বা গলায় ফাঁস দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। আদালতে দেওয়া আসামিদের জবানবন্দির সঙ্গে ময়নাতদন্তের তথ্যের মিল পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকতে পারে এমন আশঙ্কায় আসামিরা নিচতলায় গিয়ে একটি পুরোনো প্লাস পান। সেটি দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন তারা। তাদের ধারণা ছিল, এতে কোনো সিসিটিভি থাকলেও সেটি বন্ধ হয়ে যাবে। এরপর তারা আবার ওপরের দিকে যান এবং ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করেন। ঘটনার পর হত্যাকারীরা ফ্রিজ থেকে শশা ও খেজুর বের করে খায়। তারপর ওই ঘরের বাথরুমে গোসল করেছিল। হত্যার পর ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে তারা ঘরের ড্রয়ার, আলমারি ও অন্যান্য জিনিসপত্র তছনছ করেন। কিছু স্বর্ণালংকার এবং ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যান। পরে স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ কমিশনারের বক্তব্যের সাথে হত্যার ঘটনা প্রবাহের অমিল:
পুলিশ কশিনারের বক্তবের সূত্র ধরে দেখা যায়, ঘটনার রাতে কী ঘটনা প্রবাহ অনুসন্ধান উঠে এসেছে। প্রতিবেশির একজনের বাসার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় গ্রেফতার সিদ্ধার্থ দাস(২২) ভোর বেলা ৪টা ৩৮ মিনিটে সে কোথাও যাচ্ছিল। আবার ৪টা ৪৩ মিনিট পর্যন্ত বাড়ির সামনের গলি পথে ফিরে আসে। ময়না তদন্তের রিপোর্টএ উল্লেখ রয়েছে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে আঘাতের চিহ্ন ছিল, ৪ জনের পাকস্থলিতে খাবার ভরা ছিল। তা হলে হত্যার দু’ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টা আগে তারা খেয়েছিল। ভোর রাতে হত্যার ঘটনা ঘটলে পাকস্থলিতে খাবার থাকার কথা নয়। এটি ময়না তদন্তকারী চিকিৎসকের স্পষ্ট বক্তব্য।
খুনের শিকার আগামী চক্রবর্তীর ঘটনার রাতে বন্ধুর ফোনে কথোপকথনের সময় ভোর ৫টা ৫৫ মিনিট। সেখানে সে বলছিল রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় খুব কষ্টে রাত কেটেছে। পুলিশের তথ্য হত্যার পর সিসিটিভি ফুটেজ যাতে না পায় সে জন্য বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করেছেছিল হত্যাকারী দু’জন। কিন্তু ঘটনা প্রবাহ বলছে হত্যার আগে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। এ সব ঘটনা প্রবাহ পুলিশের তদন্তের বক্তব্যকে সমর্থন করে না। অনেক তথ্য বিভ্রাট ও অমিল রয়েছে।
যে সব আলামত আমলে নেয়নি সিআইডি ও পুলিশ:
এখনো দুই অভিযুক্তের ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়নি। ফ্রিজের হাতলের এবং তিনতলার ছাদ থেকে নীচ তলার ঘরের ভেতরের কোন ফিংগার প্রিন্ট সংগ্রহ করেনি সিআইডি টিম, যে বাথ রুমে গোসল করেছিল হত্যাকারীরা সে বাথরুমে রক্ষিত ভেজা বা শুকনো কাপড় সংগ্রহ করা হয়নি। ইয়াবাসক্ত হওয়ায় উত্তেজিতভাবে ৪টি হত্যার ঘটনা পুলিশ বয়ান করলেও গ্রেফতার দু’জনের ডোপ টেস্টের জন্য প্রথমে প্রস্রাব এর নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি। এ সব অসঙ্গিও বিষয়ে যুগান্তরে খাবর প্রকাশের ১০দিন পরে ডোপ টেস্ট করা হয় হত্যার দায়ে কারাগারে আটক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের। তবে এখনো ডিএনএর নমুনা নেয়া হয়নি কারাগারে গ্রেফতার অভিযুক্ত দু’জনের তা জানা গেছে মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ (ক্রাইম এণ্ড অপস) কমিশনার তোফায়েল আহমেদের বক্তব্যে। এদিকে, আদালতের অনুমতি নিয়ে কারাগারের গেটে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার জিজ্ঞাসাবাদে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস তাদেও ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দির বক্তব্য থেকে সরে এসেছে এবং নতুন বক্তব্য তুলে ধরেছে বলে একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গায়েন্দা পুলিশের ওসি জিন্নাত আলী বলেন, এটি যেহেতু খুবই স্পর্শকাতর মামলা আমরা আগাম কোন তথ্য মিডিয়া প্রকাশ করে মামলার গতিকে বাধাগ্রস্ত বা বিভ্রান্ত করতে চাই না। এ নিয়ে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পরুক তা উচিত নয়। এ নিয়ে পুলিশের মিডিয়া পার্সন করা বলবেন। তাই এসব ঘটনা প্রবাহ নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে।
হত্যার মোটিভ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি:
এদিকে হত্যার সাথে গ্রেফতার দু’জনই জড়িত বলে যদিও পুলিশ প্রাথমিকভাবে বলেছিল তা নিয়েও এখন স্বয়ং রংপুর মহনগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি সনাতন চক্রবর্তী সন্দিহান বলে স্বীকার করেছেন । তার ধারণা আরও কোন ঘটনা রয়েছে এবং অন্য কেউ জড়িত আছে তা সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস আড়াল করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই সে দিকেও পুলিশের নজর এখন। যারা ঘটনার পর গা ঢাকা দিয়েছে তাদের একজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার মোটিভ সম্পর্কে জানার জন্য বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। তাকে গ্রেফতার বা জিজ্ঞাসাবাদ করলে হয়তো হত্যার মোটিভ সম্পর্কে জানা যাবে।
অভিযুক্ত সিদ্ধার্থের পরিবারের ভারতের শিলিগুড়িতে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি:
সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস দু’জনেই পিসতুতো ও মামাতো ভাই। সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস ও কাকা বিজয় দাস। স্ব-পরিবারে হত্যার শিকার গণপতি চক্রবর্তী হত্যার দেড় মাস আগে ওই শিক্ষকের লাগোয়া ২ শতক জমি ও বাড়ি বিক্রি করে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। এ জন্য তারা ৩৫ লাখ টাকা দিয়ে হত্যার প্রায় দেড় মাস আগে বিধান চন্দ্র দাসের সাথে ২০ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে চুক্তিনামা সম্পাদন করেন। তা স্বীকার করেছেন গ্রেফতার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস ও কাকা বিজয় দাস। তারা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে আত্মীয়ের সূত্র ধরে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল। এই বিষয়টিও এই হত্যার ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে মামলার রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা।
উল্লেখ্য গত ২২ আগস্ট শনিবার দিবাগত রাত ১১ টার দিকে রংপুর নগরীর কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী(৫৫), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী(২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী(১১) প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ২৩ আগস্ট রোববার ভোরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ নামে দুজনকে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
