রবিবার | অক্টোবর ২৫, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশচট্টগ্রাম পটিয়ায় ‘নাস্তা কম’ হওয়ার জেরে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যু

উপহারের বাক্সে লুকিয়ে ছিল কোন নিষ্ঠুরতা?

পটিয়ায় ‘নাস্তা কম’ হওয়ার জেরে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যু

পটিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে সেলিম চৌধুরী: বাবার বাড়ি থেকে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পাঠানো হয়েছিল সযত্নে তৈরি হাতের নাস্তা। বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত এই ভালোবাসার উপহারই যে এক তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা তরুণীর জীবনের শেষ ট্র্যাজেডি ডেকে আনবে, তা হয়তো কল্পনাও করেনি কেউ।

চট্টগ্রামের পটিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে ‘নাস্তার পরিমাণ কম হওয়া নিয়ে সৃষ্ট এক নির্মম পারিবারিক হিংস্রতার শিকার হয়ে টানা ৯ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন ২২ বছর বয়সী গৃহবধূ সিফাতুন নুর।

শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

তার এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নিভে গেছে একটি সম্ভাবনাময় প্রাণ এবং পৃথিবীর আলো দেখার আগেই ঝরে গেছে তার গর্ভের তিন মাসের অনাগত সন্তানটি।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মাত্র পাঁচ মাস আগে চন্দনাইশের বাসিন্দা মো. নুরের ছোট মেয়ে সিফাতুনের সাথে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল পটিয়া কুসুমপুরা ইউনিয়নের দুবাইপ্রবাসী মো. তারেকের।

বিয়ের পর স্বামী প্রবাসে থাকায় শ্বশুরবাড়িতেই থাকতেন সিফাতুন। স্বজনদের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই যৌতুকসহ বিভিন্ন অছিলায় তার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো।

গত ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় সিফাতুনের মা জুহিনুর আক্তার মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে নিজের হাতে তৈরি নাস্তা নিয়ে বেড়াতে যান। কিন্তু সেই নাস্তার পরিমাণ কেন কম হলো—এই সামান্য অজুহাতে শাশুড়ি ও ননদদের সাথে তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়।

একপর্যায়ে তা রূপ নেয় মধ্যযুগীয় বর্বরতায়।অভিযোগে প্রকাশ, কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সিফাতুনের শাশুড়ি রিজিয়া বেগম (৬০) মেয়ের সামনেই তার বৃদ্ধা মাকে মারধর শুরু করেন।

মাকে বাঁচাতে সিফাতুন এগিয়ে এলে ননদ রাশেদা বেগম (৫৫) ও সুমি আক্তার (৫২) তার চুলের মুঠি ধরে মাটিতে আছড়ে ফেলেন। তিনি যে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী, সেই মানবিক বোধটুকুও হারিয়ে ফেলে তার ওপর এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি, লাথি ও তলপেটে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়।

মা ও মেয়ের চিৎকারে প্রতিবেশীরা এসে তাদের উদ্ধার করলেও ততক্ষণে সিফাতুনের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।গুরুতর আহত অবস্থায় ওই রাতেই সিফাতুনকে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হলে অবস্থার অবনতি দেখে চিকিৎসকরা তাকে সরাসরি আইসিইউতে স্থানান্তর করেন।

সেখানে দীর্ঘ ৯ দিন সংজ্ঞাহীন অবস্থায় লাইফ সাপোর্টে ছিলেন তিনি।নিহতের পিতা মো. নুরের অভিযোগ, এই নির্মম নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডকে আড়াল করতে শ্বশুরবাড়ির লোকজন ঘটনাটিকে ‘আত্মহত্যার চেষ্টা বলে এলাকায় অপপ্রচার চালায়।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমার গর্ভবতী মেয়েটাকে ওরা পিটিয়ে মেরে ফেলল, আর এখন বাঁচার জন্য আত্মহত্যার নাটক সাজাচ্ছে। আমি এই পরিকল্পিত খুনের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।

ঘটনার দিনই (১৪ অক্টোবর) সিফাতুনের মা বাদী হয়ে পটিয়া থানায় শাশুড়িসহ তিনজনকে অভিযুক্ত করে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন।

তবে শুক্রবার সিফাতুনের মৃত্যুর পর মামলাটি এখন হত্যা মামলায় রূপ নিতে যাচ্ছে।

পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক দৈনিক জনতা’কে জানান, গৃহবধূর ওপর হামলার ঘটনাটি পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা