তুরাগ থেকে মনির হোসেন জীবন : রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের বাজারগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মরণঘাতী সিনথেটিক মাদক। নগরীসহ দেশজুড়ে সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে সর্বনাশা এই মাদক। হাত বাড়ালেই সহজে পাওয়া যায় মরণ নেশা মাদক। চারদিকে বাড়ছে মাদকের বিস্তার ও কারবার। মাদকের ভয়াল থাবায় ধ্বংসের পথে দেশের যুবসমাজ। ফলে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরাও। সে কারণেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ- তরুণী ও নারীরা। তাদের আশঙ্কা, কখন প্রিয় সন্তান মাদকের স্রোতে দিক হারিয়ে নেশার জালে আটকা পড়ে যায়, কখন এর ভয়াল ছোবলে নেশাগ্রস্ত হয়ে ঠাঁই হয় মরণকূপে। মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তার থেকে সন্তানদের রক্ষা করতে উদ্বিগ্ন মা-বাবার পাশাপাশি পুরো সমাজ। একসময় ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিলের মতো প্রচলিত মাদকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের নতুন সিনথেটিক মাদক। ইয়াবা-গাঁজার গণ্ডি পেরিয়ে বর্তমানে বাজারে আসছে জম্বি ড্রাগ, ‘আইস’ বা ক্রিস্টাল মেথ, এলএসডি, এমডিএমএ, ডিওবি, ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম, ব্ল্যাক কোকেনসহ অন্তত ১৩ ধরনের নতুন মাদক। বিদেশ থেকে কুরিয়ার সার্ভিস এর মাধ্যমে আকাশ পথে এবার বাংলাদেশে ঢুকছে জম্বি ড্রাগসহ ১৩ ধরনের সিনথেটিক মাদক। এই মাদক ব্যবহারে ভয়াবহ ক্ষতিরমুখে পড়তে পারে মানুষের মস্তিষ্ক ও শরীর। ২০১৮ সালে দেশে এ মরণঘাতী মাদকের ব্যবহার শুরু হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ ল্যাবরেটরিতে এ ধরনের মাদক উৎপাদনের তথ্য রয়েছে। এসব মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। খবর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্বস্ত তথ্য সূত্রের।
সমাজের সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মাদক চক্রগুলো এখন তরুণদের বিশেষভাবে টার্গেট করছে। প্রযুক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস এবং সীমান্তপথ ব্যবহার করে দেশে ঢুকছে এসব মাদক। নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদকের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো দ্রুত আসক্তি তৈরি করা। অনেক ক্ষেত্রে অল্প পরিমাণ মাদকেই তীব্র নেশা সৃষ্টি হয়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি মানসিক ভারসাম্যহীনতা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, হতাশা ও নানা ধরনের শারীরিক- মানসিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তি শুধু একজন ব্যক্তির জীবনকেই বিপন্ন করে না; এর প্রভাব পড়ে পরিবার ও সমাজের ওপরও। মাদকাসক্ত তরুণদের একটি অংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এতে অপরাধ প্রবণতা ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়ছে।
অন্যদিকে মাদক কারবারিরা ক্রমেই কৌশল পরিবর্তন করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে অনলাইন যোগাযোগ, গোপন নেটওয়ার্ক এবং কুরিয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে মাদক সরবরাহের চেষ্টা করা হচ্ছে। নতুন নতুন রাসায়নিক মাদক বাজারে আসায় এগুলো শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করাও সংশ্লিষ্টদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্য অনুসন্ধান ও প্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছেন, মাদকের বিস্তার ঠেকাতে শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ আরও সহজলভ্য করা জরুরি। কারণ, মাদকের ভয়াল বিস্তার রোধ করা না গেলে এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে দেশের তরুণ প্রজন্মকে। আর তরুণ সমাজ বিপথগামী হলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে পুরো দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের ওপর। বর্তমানে যোগ হয়েছে নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যান্সের (এনপিএস) বিস্তার। ডার্ক ওয়েব, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এসব মাদকের কেনাবেচা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণরা। ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন পথে নতুন নতুন সিনথেটিক মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে খাত, আইস বা ক্রিস্টাল মেথ, এমডিএমএ, এলএসডি, টাপেন্টাডল, ট্রামাডল, ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম, ডিওবি, কুশ, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জমাট হেরোইন, ব্ল্যাক কোকেন ও এমডিএমবি। এসব মাদকের অনেকগুলোই ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে ডাকযোগে কিংবা আকাশপথে পার্সেলের মাধ্যমে দেশে আসছে। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসও পাচারকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চল দিয়ে সিনথেটিক মাদক প্রবেশের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। সীমান্তপথের পাশাপাশি এখন অনলাইনভিত্তিক মাদক কেনাবেচা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
প্রযুক্তির ব্যবহার মাদক কারবারকে আরও জটিল করে তুলেছে। ডার্ক ওয়েব, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে যোগাযোগ এবং লেনদেন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পার্সেলে করে মাদক পাঠানোর ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে। অনলাইন লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ এবং পরিচয় গোপন রাখার নানা কৌশল ব্যবহার করছে অপরাধীরা। এসব কারণে প্রচলিত মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের ওপর জোর দিচ্ছে ডিএনসি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসি’র কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের বলেন, নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদক দ্রুত আসক্তি তৈরি করে। একই সঙ্গে অল্প পরিমাণ মাদক দিয়ে বড় বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফলে আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের কাছে এসব মাদক ব্যবসা তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক। ডিএনসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট ও গোল্ডেন ওয়েজের মতো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ মাদক উৎপাদন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে মাদক পাচার করা হয়। এসব মাদক পরিবহনের বিভিন্ন রুটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি বাংলাদেশের অবস্থান। এর পাশাপাশি ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ ও দুর্গম সীমান্ত রয়েছে। এসব সীমান্তপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অভিজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট মহলের ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মাদক কারবারিদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য দেশের উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীরা। নতুন ধরনের মাদককে কখনো ভিন্ন নাম বা আকর্ষণীয় পরিচয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তরুণদের কাছে এসব মাদক পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত প্রাকৃতিক মাদকের তুলনায় অনেক সিনথেটিক মাদক দ্রুত আসক্তি তৈরি করে। অল্প পরিমাণ মাদক পরিবহন ও গোপনে সংরক্ষণ করা তুলনামূলক সহজ হওয়ায় পাচারকারীদের জন্য এটি বড় সুবিধা।
ফলে দেশের শহরাঞ্চলের পাশাপাশি ধীরে ধীরে গ্রামাঞ্চলেও এসব মাদকের বিস্তার ঘটছে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে ভয়াবহ ক্ষতি : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিনথেটিক মাদকের ক্ষতি শুধু সাময়িক নেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন এসব মাদক গ্রহণ করলে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
এতে স্মৃতিশক্তি ও চিন্তার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। দেখা দিতে পারে তীব্র মানসিক বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক সন্দেহ, হ্যালুসিনেশন, হতাশা ও আত্মবিধ্বংসী প্রবণতা। দীর্ঘমেয়াদে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
একের পর এক নতুন মাদক শনাক্ত : বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে একের পর এক নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদক শনাক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে প্রথমবারের মতো ‘ব্ল্যাক কোকেন’ নামে নতুন মাদক ধরা পড়ে।
এর আগে ২০২১ সালের নভেম্বরে খুলনায় উদ্ধার করা হয় ডিওবি বা ডাইমিথোক্সিব্রোমো অ্যামফিটামিন। আন্তর্জাতিক রুটে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পোল্যান্ড থেকে মাদকটি বাংলাদেশে এসেছিল বলে জানা যায়। এটি ছিল দেশে ডিওবি শনাক্ত হওয়ার প্রথম ঘটনা। তদন্তে উঠে আসে, চোরাকারবারিরা ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিটকয়েনের মাধ্যমে এ মাদক সংগ্রহ করেছিল। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর জিগাতলায় প্রথমবারের মতো আইস বা ক্রিস্টাল মেথ উদ্ধার করা হয়। একই বছরের জুলাইয়ে মহাখালী ডিওএইচএসের একটি বাসা থেকে প্রথমবারের মতো এলএসডি উদ্ধার করা হয়।
আইস বা ক্রিস্টাল মেথ কতটা ভয়ংকর: আইস বা ক্রিস্টাল মেথ অত্যন্ত শক্তিশালী সিনথেটিক মাদক। দেখতে অনেকটা স্বচ্ছ কাচের টুকরা বা স্ফটিকের মতো হওয়ায় এর নাম হয়েছে ক্রিস্টাল মেথ।
এটি সরাসরি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে। এর ফলে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। দেখা দিতে পারে তীব্র অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও হ্যালুসিনেশন। সংশ্লিষ্টদের মতে, মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ ল্যাবরেটরিতে এ ধরনের মাদক উৎপাদনের তথ্য রয়েছে।
এলএসডি ও এমডিএমএর বিস্তার : এলএসডি অত্যন্ত শক্তিশালী সাইকেডেলিক মাদক। এটি গ্রহণের পর বাস্তবতা সম্পর্কে মানুষের অনুভূতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। তীব্র হ্যালুসিনেশন ও বিভ্রম তৈরি করতে পারে এই মাদক।
অন্যদিকে এমডিএমএ একটি শক্তিশালী সিনথেটিক মাদক, যা ইউরোপের বিভিন্ন অবৈধ ল্যাবরেটরিতে উৎপাদনের তথ্য রয়েছে। নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়াম এ ধরনের মাদক উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
টাপেন্টাডল ও ট্রামাডলের অপব্যবহার :
টাপেন্টাডলকে শক্তিশালী সিনথেটিক মাদক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ট্রামাডল মূলত ব্যথানাশক ওষুধ হলেও অনিয়ন্ত্রিত ও অপব্যবহারে এটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অতিরিক্ত ব্যবহারে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা, খিঁচুনি ও স্নায়ুতন্ত্রে ক্ষতিকর প্রভাব দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে জীবনহানিও ঘটতে পারে।
ডিএমটি ও ম্যাজিক মাশরুম : ডিএমটি বা ডাইমিথাইলট্রিপ্টামাইন একটি শক্তিশালী হ্যালুসিনোজেনিক মাদক। এটি গ্রহণের ফলে তীব্র দৃষ্টিভ্রম ও বাস্তবতাবোধের পরিবর্তন ঘটতে পারে।
ম্যাজিক মাশরুমও সাইকেডেলিক বা হ্যালুসিনোজেনিক মাদক। এতে থাকা সিলোসাইবিন ও সিলোসিন মানুষের মধ্যে তীব্র হ্যালুসিনেশন তৈরি করতে পারে। এর প্রভাবে আনন্দের পাশাপাশি ভয়, আতঙ্ক, হৃদস্পন্দন ও শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত ঘামের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
প্রচলিত মাদকের বাইরে নতুন বিপদ : কুশ, ডিওবি, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জমাট হেরোইন, ব্ল্যাক কোকেন ও এমডিএমবিসহ নতুন নতুন মাদকের বিস্তার বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) কর্মকর্তাদের মতে, নতুন এসব মাদকের বড় সমস্যা হলো—সবগুলো একই সময়ে প্রচলিত মাদক হিসেবে পরিচিত নয়। কোনো কোনো নতুন রাসায়নিক মাদক আইনগতভাবে শিডিউলভুক্ত হওয়ার আগেই বাজারে চলে আসছে। ফলে সেগুলো শনাক্ত, শ্রেণিবদ্ধ ও আইনগত ব্যবস্থার আওতায় আনতে সময় লাগে। সিনথেটিক মাদকের বিস্তার ঠেকাতে প্রচলিত অভিযানের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস, অনলাইন লেনদেন এবং সন্দেহভাজন নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন মাদকের রাসায়নিক উপাদান শনাক্ত করতে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে তথ্য বিনিময় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে সিনথেটিক মাদকের বিস্তার পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি, সহজলভ্য চিকিৎসা এবং কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন। কারণ, ল্যাবে তৈরি নতুন নতুন সিনথেটিক মাদকের বিস্তার শুধু মাদক নিয়ন্ত্রণের সমস্যা নয়; এটি তরুণ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে।
ঢাকা আহছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের সিনিয়র একজন সাইকোলজিস্ট সাংবাদিকদের বলেন, সিনথেটিক মাদক মস্তিষ্ক ও শরীরে গভীর ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে মানসিক বিকার, স্মৃতিভ্রংশ, শারীরিক অবক্ষয় ও প্রাণঘাতী জটিলতা দেখা দিতে পারে। তার মতে, মাদকাসক্তি চিকিৎসাযোগ্য। এর জন্য সমন্বিত চিকিৎসা, মনোসামাজিক থেরাপি এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রয়োজন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)র অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ গোলাম আজম গণমাধ্যমকে বলেন, শুধু ইয়াবা বা গাঁজা নয়, নতুন সিনথেটিক মাদকও তরুণ সমাজের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। শহর থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বরে দেশে প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়া থেকে আসা নতুন মাদক এমডিএমবির একটি চালান জব্দ করা হয় বলেও জানান তিনি।
এসময় তিনি আরো বলেন, যখনই কোনো সিনথেটিক মাদক জব্দ করা হচ্ছে, তখনই কারবারিরা সেটি ভিন্ন নামে প্রচার করে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নতুন কোনো মাদক পাওয়া গেলে সেটি পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হচ্ছে। সিনথেটিক মাদক হিসেবে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ডিএমপি’র উত্তরা বিভাগের পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক জনতাকে বলেন, আমরা মাদকদ্রব্য বেচাকেনা, সেবন ও মাদকদ্রব্য নির্মুলে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ফলো করছি। মাদক উদ্ধার অভিযান আগের চেয়ে অনেকটাই জোরদার করা হয়েছে। মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোন ব্যক্তিকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়া হবে না বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে অবৈধ মাদক বেচাকেনা বন্ধ ও পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে মাদক অনুপ্রবেশ রোধে এ ব্যাপারে বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, পুলিশ প্রধান, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি),
ডিএমপির কমিশনার, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), বিজিবি, এপিবিএন, সরকারের অন্যান্য সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট মহলের কর্মকর্তাদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দেশের সর্বস্তরের জনগণ ।
