খুলনা থেকে বি এম রাকিব হাসান : সুন্দরবনে সম্প্রতি নতুন করে বনদস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলে, বাউয়ালি ও মৌয়ালসহ সামগ্রিক বনজীবী সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র নিরাপত্তা সংকট ও চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে সুন্দরবনকে “দস্যুমুক্ত” ঘোষণা করা হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বনের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর থেকে একাধিক সশস্ত্র দস্যুবাহিনীর আনাগোনা এবং জেলেদের অপহরণের ঘটনা নতুন করে উপকূলীয় অঞ্চলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। চার বাহিনীর ৫২ জন আত্মসমার্পন করলেও থেমে নেই দস্যুবৃত্তি। সর্বশেষ ২১ জন জেলেকে অপহরণ করেছে দস্যুরা। বনমন্ত্রীর আহবানে কোনভাবে সাড়া দিচ্ছে না দস্যু দলগুলো।
খুলনা সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের সুন্দরবন উপকূলবর্তী প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষের বসবাস। এলাকায় তেমন কর্মক্ষেত্রও না থাকায় অধিকাংশ মানুষ জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। মাছ-কাঁকড়া, মধু আহরণ, গোলপাতা আহরণসহ নানা ধরনের পেশার সঙ্গে জড়িত এ উপজেলার মানুষ। গত কয়েক বছর সুন্দরবনে বনদস্যুদের উৎপাত কমছিল। কিন্তু সম্প্রতি সুন্দরবনে আবারও বনদস্যুদের উৎপাত বেড়েছে। মাছ ধরতে যাওয়া জেলে-বাওয়ালিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ নেওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।
সূত্রমতে, ২০২৩-২০২৪ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে ছোট-বড় দস্যু দলের পুনর্বিন্যাস ঘটেছে। বিশেষ করে সম্প্রতি (২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর) পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের আমবাড়িয়া, কটকা ও নারিকেলবাড়িয়া এলাকা থেকে মজনু ও শরীফ বাহিনীসহ বিভিন্ন অজ্ঞাত দস্যুদল দুই দিনে অন্তত ২১ জন জেলেকে অপহরণ করেছে। দস্যুরা জেলেদের জিম্মি করে নৌকা, মোবাইল ফোন ও রসদ লুটে নিচ্ছে এবং মুক্তিপণের দাবি জানাচ্ছে। মধু ও গোলপাতা সংগ্রহের মৌসুমে মৌয়াল ও বাউয়ালিদের কাছ থেকে ট্রলার প্রতি বড় অঙ্কের চাঁদা বা “টোকেন মানি” দাবি করা হচ্ছে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে মারধর, বনের গভীরে আটকে রাখা কিংবা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে অনেকেই জীবিকার তাগিদে বনে প্রবেশ করতে ভয় পাচ্ছেন। ক্রমাগত চাঁদাবাজি এবং অপহরণের ভয়ে অনেক দরিদ্র বনজীবী তাদের পৈতৃক পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা উপকূলীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেষ্ট রেঞ্জার মিল্টন রায় জানান, সম্প্রতি বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন সুন্দরবনের ভাঙ্গা, আমবাড়ীয়া ও নারিকেলবাড়ীয়া এলাকায় মাছ ধরার সময় জেলেদের বহরে হামলা চালায় বনদস্যু মজনু বাহিনী সদস্যরা। এ সময়ে তারা একটি ফিশিং ট্রলারসহ ১৫টি নৌকা থেকে একজন করে সার্বমোট ১৫জন জেলেকে মুক্তিপণের দাবিতে আপহরণ করে। অপহৃত জেরেদের মধ্যে ১০ জেলের নাম জানা গেছে। তারা হলেন, আরিফ (২৫), সগীর (৩৪), মিঠু (৩০), ফেরদাউস (২৮), ইব্রাহিম (৩৫), ইমরান (২৫), মোস্তাফিজ (৩৫), আলাআমিন (২৮), হানিফ (৩৮), মারুফ (৪৯)। এসব জেলেদের বাড়ি খুলনা, বরগুনার পাথরঘাটা ও তালতলী এলাকায়। এ সকল জেলেরা বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে নিয়েচর পাটা, পোকাজাল ও বড়শি দিয়ে সুন্দরবনের খালে মাছ ধরছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব এলাকায় প্রশাসনের নজরদারি কমে যাওয়ার কারণেই সেখানে অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে। আসাবুর বাহিনী, শরীফ বাহিনী, আবদুল্লাহ বাহিনী, মঞ্জুর বাহিনী এবং আলিফ ওরফে দয়াল বাহিনী, সাগর বাহিনী-আলম ওরফে পাটওয়ারী বাহিনী পশ্চিম সুন্দরবন, খুলনার কয়রা ও দাকোপ উপজেলা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলাজুড়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের সময় কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া কিছু বন্দিও এই অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে ১৫ থেকে ২০টি দস্যু গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এমনকি অতীতে আত্মসমর্পণ করা অনেক দস্যুও আবার পুরোনো পেশায় ফিরে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলেরা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর বনে প্রবেশ করার পর থেকেই এই চাঁদাবাজির মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে বনে নির্বিঘেœ কাজ করার জন্য নৌকা প্রতি মোটা অঙ্কের অগ্রিম “সুরক্ষা অর্থ” বা টোকেন মানি দিতে হচ্ছে।
উপকুলীয় বনজীবী ফোরামের আহবায়ক বাচ্চু মীর বলেন, এই দস্যু আতঙ্কের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনের পর্যটন শিল্পে। এছাড়া দস্যুরা অবৈধ হরিণ শিকার ও বিষ দিয়ে মাছ শিকারের মতো অপরাধে জড়িত থাকায় বনের পরিবেশগত ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়েছে। যদিও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড ও বন বিভাগ যৌথ অভিযান জোরদার করেছে। কোস্টগার্ডের ‘অপারেশন রিস্টোর পিস’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’-এর মাধ্যমে বেশ কয়েকজন দস্যুকে অস্ত্রসহ আটক করা হয়েছে এবং বেশ কিছু অপহৃত জেলেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
