সুমন হোসাইন, বেনাপোল প্রতিনিধি: বেনাপোল স্থলবন্দরের ২৯ নং পণ্যগারে মিথ্যা ঘোষণায় আনা একটি আইপিএস চালানে কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি ধরা পড়েছে। বন্দরের গেট ডিভিশনে কাস্টমসের নিজস্ব নজরদারি না থাকায় শুল্ক ফাঁকি চক্রের সদস্যদের মিথ্যা ঘোষণায় আনা পণ্য সহজেই বেরিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক এসব কারসাজি বেরিয়ে আসলেও থামছে না শুভাংকরের ফাঁকি। গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ঘাটতির পরও চলতি বছরে রাজস্ব আদায়ে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি এ বন্দরে।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, গত গত ৪ অক্টোবর ঢাকার নবাবপুরের আমদানিকারক ‘আইপি এস হাটবাজার বিডি’ (২৬৮ নবাবপুর কমপ্লেক্স, ঢাকা) ১ হাজার ৩৮৫ প্যাকেজ পণ্য আমদানি করে। যার ম্যানিফেস্ট নম্বর-৬১৩৬৫ (তারিখ-০৩/১০/২০২৬)। পণ্য চালানটি শুল্কায়নের খালাসের দায়িত্বে রয়েছে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ‘দি কমার্সিয়াল অ্যাসোসিয়েটস’। আমদানিকারক প্রতিনিধি সিঅ্যান্ডএফ কর্তৃক উক্ত পণ্য চালানটি গ্রহন করে বন্দরের ২৯ নং শেডে নামায়। পরে পণ্য চালানটিতে মিথ্যা ঘোষণার তথ্য থাকায় কাস্টম “তদন্ত, গবেষণা ও ব্যবস্থাপনা ইউনিট” (আইআরএম) কর্তৃক পরীক্ষণ করলে পণ্য চালানটিতে অতিরিক্ত ৪ প্যাকেজ পণ্য বেশি পাওয়া যায়। যার মধ্যে ঘোষণাবর্হিভূত সার্কিট পার্টস পাওয়া গেছে যার বাজার মূল্য আনুমানিক ৪০ লাখ টাকা বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কমিশনারের নির্দেশ অনুযায়ী ‘ইলেকট্রনিক্স পণ্য’ চালান (আইআরএম)-এর লিস্টেড পরীক্ষণ তালিকায় থাকলেও অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এই পণ্য চালান দীর্ঘ মাস যাবৎ নরমাল পরীক্ষণে খালাস মিলছে। ফলে সারকারে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি হচ্ছে। যেহেতু এই ‘ইলেকট্রনিক্স পণ্য চালান (আইআরএম)-এর পরীক্ষণের। সেহেতু নরমাল পরীক্ষণ বাদ দিলে। ইলেকট্রনিক্স পণ্য চালান কাস্টম “তদন্ত, গবেষণা ও ব্যবস্থাপনা ইউনিট” (আইএরএম) কর্তৃক পরীক্ষণ করলে বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি ধরা পড়বে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নরমাল পরীক্ষণের কারসাজিতে শুল্ক ফাঁকির ফলে আইপিএস পণ্য চালানে কম ‘ভিএ’ বা ওয়াট ঘোষণা দিয়ে উচ্চ ‘ভিএ’ বা ওয়াট পণ্য খালাস করে নিয়ে যাচ্ছে। আইপিএস পিস হিসাবে শুল্কায়ন যোগ্য পণ্য। ঘোষণায় আইপিএস থাকলেও এর কার্টুনে লুকায়িত ভাবে সার্কিট পার্টস প্রবেশ করিয়ে কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছে। তা ছাড়া বর্তমান বাজারে এই ‘ইলেকট্রনিক্স পণ্য’ আইপিএস উচ্চ মূল্য বিক্রি হলেও শুল্কায়নে ভ্যালু কম দেখানো হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি কর্তৃক নরমাল পরীক্ষণ ও শুল্কায়ন গ্রুপ-৬ এর কর্মকর্তাদের সাথে সখ্যায় পানির মতো পণ্য চালান খালাস করেছে। তাছাড়া বিভিন্ন আমদানিকারকের কনসাইনমেন্ট প্রতি চুক্তিতে শুল্ক ফাঁকির সুবিধায় পণ্য চালান খালাশ নিচ্ছে। যা পূর্বের খালাসকৃত পণ্য চালান পার্যলোচনা করলে শুল্ক ফাঁকির তথ্য বেরিয়ে আসবে। একই সাথে কাস্টমস ম্যানেজমেন্ট এই ইলেকট্রনিক্স পণ্য চালানে নজরদারি বাড়ালে বিপুল পরিমাণ শুল্ক আদায় বাড়বে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বেনাপোল স্থলবন্দরে জালিয়াতি ও রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা যেন পিছু ছাড়ছে না। একের পর এক বিতর্কিত ঘটনার পরও রহস্যজনকভাবে বহাল তবিয়তে রয়েছে অসাধু চক্র। গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ২৯ নম্বর শেড থেকে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে তিনটি ট্রাকভর্তি পণ্য বের হয়ে যাওয়ার ঘটনায় বন্দরের দুই শেড ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম ও রিপন বিশ্বাসকে কোজ এবং কাস্টমসের দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শহিদুল ও তরিকুলকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসনে সংযুক্ত করা হয়। শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরও আবারও সেই ২৯ নম্বর শেডেই ধরা পড়েছে ঘোষণা বহির্ভূত অতিরিক্ত পণ্যের চালান।
এ বিষয়ে ২৯ নং শেড ইনচার্জ জামাল হোসেন জানান, “চালানটিতে অতিরিক্ত ৪ কার্টন ঘোষণা বহির্ভূত পণ্য থাকায় তা আটক করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিবে।
এ বিষয়ে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ‘দি কমার্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট-এর স্বত্বাধিকারী ইসহাক আলীর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও রিসিভ না করায় বক্তব্য জানা যায়নি।
এ বিষয়ে কাস্টমসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন জানান, আমি ছুটিতে রয়েছি, আপনি আইআরএম-এর টিমের সাথে কথা বলেন।
বিষয়টি জানতে কাস্টমসের আইআরএম-এর টিমের সহকারী কমিশনার তৌফিকুর রহমান ও রাজস্ব কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমের মুঠোফোনে কল করলে তারা রিসিভ করেননি।
