কুষ্টিয়া থেকে শরিফ মাহমুদ : ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ, ব্যাড বয়েজ,বার্নিং, বিএসবি, এইচএসবি, আরএলবি, সিডব্লিউবি, আরডিএক্স, আরডেন্ট বয়েজ, কেসিবি, ডিবি, কেকেজি, ভিডিএলইএমবি ও ‘০০৭’সহ বিভিন্ন নামের কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয়!
কুষ্টিয়া জেলা জুড়ে অলিগলিতে আবারও আলোচনায় কিশোর গ্যাং। মহল্লাভিত্তিক ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে একদিকে চলছে আধিপত্য বিস্তার, অন্যদিকে মাদক, অস্ত্র, মারামারি ও বেপরোয়া মোটরসাইকেল মহড়া। বয়সে কিশোর হলেও এসব গ্রুপের পেছনে অনেক ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বড় তরুণদের নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ক্ষমতার পালা বদলে যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় বসে, তখন তারাই এসব কিশোরগ্যাং গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শহরের হাউজিং, ঈদগাহপাড়া, কোর্টপাড়া, থানাপাড়া, হরিশংকরপুর, কালিশংকরপুর, আড়ুয়াপাড়া, আমলাপাড়াসহ বিভিন্ন মহল্লায় কিশোরদের দলবদ্ধ চলাফেরা ও তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কোথাও কয়েকজন, আবার কোনো কোনো দলে ১০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত সদস্য রয়েছে। শহর এলাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও সক্রিয় কিশোর গ্যাং চক্র। স্থানীয়দের পরিসংখ্যানে এর সংখ্যা ৩ হাজারেরও বেশি। তবে বর্তমানে সক্রিয় গ্যাংয়ের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা ও সদস্যসংখ্যা নিয়ে পুলিশের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
কুষ্টিয়া শহরে বিভিন্ন সময়ে ব্যাচভিত্তিক ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ, ব্যাড বয়েজ,বার্নিং, বিএসবি, এইচএসবি, আরএলবি, সিডব্লিউবি, আরডিএক্স, আরডেন্ট বয়েজ, কেসিবি, ডিবি, কেকেজি, ভিডিএলইএমবি ও ‘০০৭’সহ বিভিন্ন নামের কিশোর গ্রুপের তৎপরতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। প্রায় প্রতিদিন বিকেল থেকে গভীর রাত অবধি কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ মাঠের আশেপাশে এদের বিচরণ বেশি। হলার লাগানো নামি দামি ব্রান্ডের মোটরসাইকেল নিয়ে বিকট শব্দ দূষণ করে এরা চলাফেরা করে। কেউ কিছু বলারও সাহস পায় না এদের।
স্থানীয়রা জানান, শহরের বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের আড্ডা যেন ছড়িয়ে পড়েছে নির্দিষ্ট কিছু নির্জন স্পট ঘিরে। হাউজিং এলাকায় পরিত্যক্ত ভবন ও ফাঁকা জায়গা, ঈদগাহপাড়ায় নির্জন গলি ও মাঠের আশপাশ, কোর্টপাড়ায় ভবনের পেছনের ফাঁকা অংশ ও অলিগলি, থানাপাড়ায় নির্জন সড়ক ও নদীর পাড়, হরিশংকরপুর ও কালিশংকরপুর এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ ও ফাঁকা জায়গা, আড়ুয়াপাড়া ও আমলাপাড়ার বিভিন্ন গলিপথ এবং পূর্ব মজমপুর ও জাউতলার নির্জন সড়কের পাশে সন্ধ্যার পর দলবদ্ধ কিশোর-তরুণদের আনাগোনা দেখা যায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
কোথাও মোটরসাইকেল নিয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান, কোথাও আবার দলবদ্ধ আড্ডা ও উচ্চ শব্দে গান-বাজনা চলে। শুধু তাই নয়, এসব জায়গা মাদক সেবন, মারামারি ও আধিপত্য বিস্তারের কেন্দ্র হয়ে উঠছে, যার প্রভাব পড়ছে আশপাশের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক চলাচল ও নিরাপত্তায়।
২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে শহরে ১৩টি কিশোর দলের কথা বলা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিটি দলে ২০ থেকে ২৫ জন সদস্য রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা জানা যায়, রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব কিশোর গ্যাং বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রভাবশালীরা তাদেরকে ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রভাব বিস্তার ও অপরাধমূলক কাজ করিয়ে নিচ্ছে। এসব গ্যাংয়ের অধিকাংশ সদস্য দেশীয় তৈরি ধারালো অস্ত্র, ড্যাগার, চাকুসহ অন্যান্য অস্ত্র সব সময় নিয়ে বেড়ানোর তথ্য রয়েছে।
কিশোর গ্যাং গ্রুপের সঙ্গে জড়িত সাইফ বলেন, ‘শুরুতে কয়েকজন বন্ধু মিলে আড্ডা দিতাম। পরে বড় ভাইদের সঙ্গে চলাফেরা করতে করতে তাদের গ্রুপে জড়িয়ে পড়ি। প্রথমে শুধু ঘোরাঘুরি করতাম, পরে কোথাও ঝামেলা হলে দল বেঁধে যাওয়া শুরু করি। এভাবেই কখন যে আড্ডা থেকে মারামারি আর নানা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছি, বুঝতেই পারিনি। বড়রা বললে অনেক সময় এমন কাজও করেছি, যেটা করা ঠিক ছিল কি না, তখন ভাবিনি।’
শহরের বিভিন্ন এলাকায় দলবদ্ধভাবে মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুতগতিতে চলাচল ও মহড়া দিয়ে বেড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। কিশোরদের বেপরোয়া চলাফেরার সঙ্গে মডিফাই করা মোটরসাইকেলের ব্যবহারও বাড়ছে। কিছু মোটরসাইকেলের মাডগার্ড খুলে কিংবা সাইলেন্সার-এক্সহস্টে পরিবর্তন করে উচ্চ শব্দে চলাচল করা হয়। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর আবাসিক এলাকা ও ব্যস্ত সড়কে এসব মোটরসাইকেলের বিকট শব্দে পথচারী ও বাসিন্দারা অস্বস্তিতে পড়ছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, রাতের বেলায় বারবার এমন শব্দে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ঘুম ও স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
এ ছাড়া নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়া, এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং শক্তির জানান দিতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের মধ্যে মাঝেমধ্যেই বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। কুষ্টিয়ায় কিশোর অপরাধ নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে এমন বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার এবং গ্যাংভিত্তিক সংঘাতের একাধিক নজির উঠে এসেছে। বিরোধ থেকে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। কুষ্টিয়ায় তরিকুল ও মিলন হোসেন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, কুষ্টিয়ায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন কুষ্টিয়া জেলা কারাগার ভেঙে পালানোর নেতৃত্ব প্রদানকারী নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শেখ সজীব ওরফে এসকে সজীব। কোনো কোনো সূত্রের দাবি, তার নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৬০০ কিশোর-তরুণ ছিল। তৎকালীন সময়ে তিনি শহরের বিভিন্ন মহল্লাভিত্তিক গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করতেন।
বর্তমানে এসকে সজীব পলাতক থাকলেও তার সঙ্গে আগে চলাফেরা করা কয়েকটি কিশোর গ্রুপের সদস্যরা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বলয়ে সক্রিয় রয়েছে। কেউ কেউ বিভিন্ন সংগঠনের পদ-পদবিও পেয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের মিছিলে সজীবের নেতৃত্বে কিশোর গ্যাং সদস্যরা জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে সূত্রের দাবি।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০২৪ সালে মিলন হোসেন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের প্রসঙ্গ ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং গ্যাং-সংশ্লিষ্ট নানা অপরাধের তথ্য পাওয়া যায়।
২০২৬ সালের ৮ মে খোকসার শোমসপুরে এক যুবককে ডেকে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর কিশোর গ্যাংয়ের দলবদ্ধ সহিংসতার বিষয়টি আবারও সামনে আসে।
এ ঘটনার এক মাস পরেই গত ৩ জুলাই রাতে কুমারখালীর লালনবাজার এলাকায় ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম আরিফকে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে হাতুড়িপেটা করে গুরুতর আহত করার অভিযোগ ওঠে। পরে পাঁচ থেকে ছয়টি মোটরসাইকেলে করে একদল লোক তার গ্রামের বাড়ি হাঁসদিয়া চরে গিয়ে হামলা ও কয়েক দফা গুলিবর্ষণ করে বলে অভিযোগ করেন স্বজন ও এলাকাবাসী।
গত ২১ আগস্ট দৌলতপুরে টাপেন্টাডল ট্যাবলেট ও মোটরসাইকেলসহ আনন্দ মোল্লা (২৮) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং কিশোর গ্যাংয়ের ‘রিং লিডার’ হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় একাধিক অভিযোগ থাকার কথাও পুলিশ জানিয়েছে।
উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা জানিয়েছেন, কুষ্টিয়া জেলা জুড়েই কিশোরগ্যাং বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এখনই এদের রুখতে না পারলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতিসহ সামাজিক অবক্ষয় ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে।
