মঙ্গলবার | সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
প্রচ্ছদ রাজনীতি ত্যাগ, কারাভোগ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের আলোচনায় গিয়াস উদ্দিন আল মামুন

মায়ের মৃত্যুর সময়ও ছিলেন বন্দি

ত্যাগ, কারাভোগ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের আলোচনায় গিয়াস উদ্দিন আল মামুন

স্টাফ রিপোর্টার: রাজনীতির কঠিন সময়ে অনেক সম্পর্ক দূরত্বে হারিয়ে যায়। কেউ আবার সময়ের সঙ্গে নিজের অবস্থান বদলান। কিন্তু দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছরের কারাভোগ, নির্যাতন, নিপিড়নের পরও গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে এসবের কিছুই স্পর্শ করতে পরেনি। ২০০৭ সালে গ্রেফতারের পর জীবনের সাড়ে ১৭ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন গিয়াস উদ্দিন আল মামুন। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বিভিন্ন মামলায় জামিন পাওয়ার পর তিনি কারামুক্ত হন।
দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময় সংবাদ মাধ্যমে নানান মুখরোচক কথা উঠে এসেছে। ১/১১ পর ফখরুদ্দীন ও মঈন ইউ আহমেদের তত্তাবধায়ক সরকারের আমল থেকে শুরু হয় দুজনকে নিয়ে মিডিয়া ট্রায়াল। এরপর পতিত স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের সময় এই মিডিয়া ট্রায়াল ভাইরাসে রুপ নেয়। বিএনপি পরিবারের কান্ডারি দেশের আপাময় জনগণের প্রিয় নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে হেয় করতে বার বার জড়ানো হয় গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের নাম। বিভিন্ন নীতিবাচক বিষয়ে মামুনকে সূত্র বানিয়ে প্রচারিত হতে থাকে বানোয়াট সংবাদ। কিন্তু বাস্তবতা হলো কারাগারে থাকা আল মামুন এসবের কিছুই জানতেন না, কিছুই বলেননি। বিএনপির শীর্ষ নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সুনাম ক্ষুন্ন হয় এমন কিছু আল মামুনের মুখ থেকে বলাতে পারলে শেখ হাসিনা তাকে কি আর ১৭ বছর কারাগারে রাখতেন!
গিয়াস উদ্দিন আল মামুন উদ্ভট এসব কথা বলবেনই বা কেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তিনি ঘনিষ্ট সহচর শুধুমাত্র বিএনপি পরিবারের একজন বিশ্বস্ত কর্মী হিসাবে। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোন ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই। অর্থপাচারের বিষয়টি একেবারে কাল্পনিক। এসব বিষয় আদালতেও ভূয়া প্রমাণিত হয়েছে। অথচ ২০০৬ সালে রাজনৈতিক পালাবদলের পর আল মামুনকে বানানো হয়েছিল দেশজুড়ে আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে। নির্যাতন নিপীড়ন চালানো হয়েছিল ২০২৪ সাল পর্যন্ত। আল মামুনের ঘনিষ্ঠজনদের বক্তব্য, তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ককে ১/১১ তত্তাবধায়ক ও পতিত হাসিনা সরকার উদ্দেশ্যমূলকভাবে এমনভাবে প্রচার করে যা বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। তারেক রহমানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মামুনের বিরুদ্ধে মোট ২২টি মামলা করা হয় বলে জানান তার আইনজীবী। পতিত স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে হাইকোর্ট একটি দুর্নীতি মামলায় তাঁর তিন বছরের সাজা বাতিল করে তাঁকে খালাস দেন। এরপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আপিল বিভাগ তাঁর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় হাইকোর্টের সাজা বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। ওই মামলায় তাঁর স্ত্রী শাহিনা ইয়াসমিনের সাজাও বাতিল হয়। সাজা বাতিল হলো, নির্দোশ প্রমাণিত হলেন কিন্তু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় সন্তান-পরিবার রেখে কারাগারে কাটালেন। অর্থপাচার মামলায়ও আসে বড় পরিবর্তন। হাইকোর্ট ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সাত বছরের কারাদণ্ডের রায় বাতিল করে তাঁকে খালাস দেন। পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগও তারেক রহমান ও গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে ওই মামলায় খালাস দেন। অস্ত্র মামলায়ও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের দেওয়া ১০ বছরের সাজা বাতিল করে মামুনকে খালাস দেন। আদালতের রায়ে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে তাঁর আইনজীবী জানান। অর্থাৎ, যেসব মামলায় একসময় তাঁকে দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছিল, পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন আইনি ফলাফল। মামুনের ঘনিষ্ঠজন ও বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতাই তাঁকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হয়রানির লক্ষ্য বানিয়েছিল। তাঁদের বক্তব্য-মামুনকে আইনি ও সামাজিকভাবে চাপে রেখে তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তারপরও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপি পরিবারের বিরুদ্ধে যায় এমন একটি কথা বলাতে পারেনি হাসিনা সরকার। এজন্যই আল মামুনকে দীর্ঘ সময়জুড়ে কারাভোগ করতে হয়েছে। সাড়ে ১৭ বছর। ক্যালেন্ডারের হিসাবে এটি কয়েক হাজার দিন। কিন্তু একজন মানুষের জীবনে এটি প্রায় দেড় যুগ। এই সময়ের মধ্যেই একজন শিশু জন্ম নিয়ে যুবক হয়ে উঠেন, কেউ ক্যারিয়ার গড়ে, কেউ ব্যবসা দাঁড় করায়, কেউ সন্তানের শৈশব থেকে কৈশোরে পৌঁছে যেতে দেখে। আর মামুনের জীবনের সেই সময় কেটেছে কারাগারের দেয়ালের ভেতরে। পরিবার থেকে দূরে, স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন-এক দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে। তাঁর মা মোসাম্মৎ হালিমা খাতুনের মৃত্যুর সময়ও মামুন ছিলেন কারাগারে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে মায়ের মৃত্যুর পর প্যারোলে কয়েক ঘণ্টার জন্য মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি। একজন সন্তানের জন্য মায়ের মৃত্যুর মুহূর্তে পাশে থাকতে না পারার বেদনা কতটা গভীর- তার পরিমাপ কোনো আদালতের নথিতে লেখা থাকে না।
রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতা ও সম্পর্কের বহু গল্প আছে। কিন্তু দুঃসময়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার গল্প তুলনামূলকভাবে কম। মামুনের ঘনিষ্ঠজনদের কাছে এখানেই তাঁর বিশেষত্ব। তাঁদের ভাষায়, মামলা হয়েছে, কারাগারে যেতে হয়েছে, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় হারাতে হয়েছে-কিন্তু এসবের কিছুই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি তাঁর ভালবাসা নষ্ট করতে পারেনি। এই কারণেই বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে গিয়াস উদ্দিন আল মামুন ‘বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত সৈনিক’হিসেবে পরিচিত। সাড়ে ১৭ বছর পর কারাগারের দরজা পেরিয়ে যখন তিনি মুক্ত জীবনে ফিরলেন, তখন তাঁর বয়স, সময় এবং জীবনের বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে। কিন্তু একটি বিষয় বদলায়নি-সেটি হলো বিএনপির প্রতি ভালবাসা। ইতিহাসের পাতায় সবই থাকে। আদালতের রায়ও থাকবে। যে মামলায় একসময় সাজা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেসব মামলায় নির্দোশ প্রমাণিত হয়ে উচ্চ আদালত খালাস দিয়েছেন-এটিও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ আইনি বাস্তবতা। একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলো কখনো আদালতের কাঠগড়ায় হয় না। হয় নিঃসঙ্গতার ভেতর, অপেক্ষার ভেতর, আর সম্পর্কের প্রতি নিজের বিশ্বস্ত অবস্থান ধরে রাখার ভেতর। সেই পরীক্ষায় গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের নাম দেশের মানুষের কাছে আজ-ত্যাগ, ধৈর্য ও বিশ্বস্ততার এক আবেগঘন প্রতীক।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা