বুধবার | অক্টোবর ৭, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ সেন্টমার্টিনে ভিনদেশি প্লাস্টিকের ঢল হুমকিতে প্রবাল দ্বীপের পরিবেশ

পর্যটনশিল্পেও বড় ক্ষতির আশঙ্কা :

সেন্টমার্টিনে ভিনদেশি প্লাস্টিকের ঢল হুমকিতে প্রবাল দ্বীপের পরিবেশ

কক্সবাজার থেকে মোঃ রিয়াজ উদ্দিন : পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিনের ছেঁড়াদ্বীপ এলাকায় বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য ভেসে আসায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এসব বর্জ্যের মধ্যে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী রয়েছে। বেশ কিছু বোতল ও প্যাকেটের গায়ে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম, লোগো এবং বিদেশি ভাষায় লেখা দেখা গেছে।

পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের ধারণা, সমুদ্রস্রোত ও বাতাসের প্রভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোর কোনো একটি এলাকা থেকে এসব বর্জ্য ভেসে সেন্টমার্টিনে এসে থাকতে পারে। পর্যটন মৌসুম এখনো শুরু না হওয়া এবং দ্বীপে পর্যটকদের যাতায়াত না থাকার মধ্যেই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য পাওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—তাহলে এই বর্জ্যের উৎস কোথায়?
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রস্রোতের মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য সেন্টমার্টিনের উপকূলে এসে জমা হওয়া শুধু সৈকতের সৌন্দর্য নষ্টের বিষয় নয়; দীর্ঘমেয়াদে তা প্রবাল, সামুদ্রিক প্রাণী ও দ্বীপের সামগ্রিক প্রতিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটননির্ভর এই দ্বীপের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

টেকনাফ সদর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে সেন্টমার্টিন দ্বীপ। গত শনিবার পরিবেশ অধিদফতরের স্থানীয় কর্মী আব্দুল আজিজ দ্বীপটির সর্বদক্ষিণের অংশ ছেঁড়াদ্বীপে গিয়ে সৈকতজুড়ে বিপুল পরিমাণ পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য দেখতে পান।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তখনো পর্যটন মৌসুম শুরু হয়নি। ফলে দ্বীপে পর্যটকদের যাতায়াতও ছিল না। এ অবস্থায় সৈকতে এত বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য পাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরিবেশ অধিদফতরের স্থানীয় কর্মী আব্দুল আজিজ বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্যগুলো কাছ থেকে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। অধিকাংশ বোতলই বাংলাদেশের বাইরে থেকে এসেছে বলে মনে হয়েছে। বোতলের লেবেলে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ও লোগো রয়েছে।

তার ধারণা, এসব প্লাস্টিকসামগ্রী সমুদ্রপথে ওই দুই দেশের যেকোনো একটি এলাকা থেকে ভেসে আসতে পারে।
তিনি বলেন, ‘দ্বীপে কোনো পর্যটক নেই। তারপরও এত পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য দেখে আমরা বিস্মিত। এত বর্জ্য হঠাৎ কোথা থেকে এল?’

সেন্টমার্টিনের কেয়াবন এলাকাতেও একই ধরনের বর্জ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় হোটেল মালিক সোহেল আরমান। তিনি বলেন, বোতল ও অন্যান্য প্লাস্টিক বর্জ্যের গায়ে থাকা লেবেল ও লেখা দেখে স্থানীয়দের ধারণা, এগুলো মিয়ানমার বা থাইল্যান্ড থেকে এসেছে।

তার মতে, বর্ষার প্রবল স্রোত ও দক্ষিণা বাতাসের কারণে এসব বর্জ্য সেন্টমার্টিনের উপকূলে এসে জমা হতে পারে।
সোহেল বলেন, পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয়ভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রতিবেশী দেশ থেকে ভেসে আসা বর্জ্য এখন সেন্টমার্টিনের জন্য নতুন হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

সেন্টমার্টিনকে দূষণমুক্ত রাখতে পর্যটন সীমিত করা, সৈকত পরিষ্কার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য ভেসে আসার ঘটনা সরকারি নজরদারি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বিশেষ করে দ্বীপটি যখন প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ, তখন উপকূল ও সমুদ্রপথে ভেসে আসা বর্জ্যের বিষয়ে কার্যকর নজরদারি এবং নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ কতটা হচ্ছে—সেটিও সামনে এসেছে।

পরিবেশ অধিদফতর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, প্লাস্টিকের বোতলের গায়ে থাকা কয়েকটি লোগো সংগ্রহ করে দেখা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি থাইল্যান্ডের কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের লোগো বলে মনে হয়েছে। এ ছাড়া কিছু প্যাকেটের গায়ে বিদেশি ভাষায় লেখা রয়েছে, যেগুলো মিয়ানমারের বলে মনে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। আমরা পর্যটন সীমিত করছি, সৈকত পরিষ্কারে অভিযান চালাচ্ছি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করেছি সেন্টমার্টিন দ্বীপের দূষণ কমানোর লক্ষ্যে। অথচ অন্য দেশ থেকে আসা বর্জ্যও আমাদের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটিকে দূষিত করছে।’

খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, এত বিপুল পরিমাণ বর্জ্য যদি উপকূলে এসে পৌঁছায়, তাহলে সমুদ্রের তলদেশেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্লাস্টিক জমা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সমুদ্রতলে প্লাস্টিক জমতে থাকলে প্রবালের ক্ষতি হতে পারে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তিনি জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। সমুদ্রের তলদেশে এভাবে বর্জ্য জমতে থাকলে তা সেন্টমার্টিনের প্রবাল ও জীববৈচিত্র্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এই দ্বীপের স্বচ্ছ পানি, প্রবাল, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। কিন্তু সৈকতজুড়ে প্লাস্টিকের স্তূপ, দুর্গন্ধ ও দূষিত পরিবেশের চিত্র ছড়িয়ে পড়লে পর্যটকদের আকর্ষণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিবেশ দূষণের কারণে একদিকে যেমন দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হবে, অন্যদিকে পর্যটকদের নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে দ্বীপের হোটেল, রেস্তোরাঁ, নৌযান, পর্যটনসেবা ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর।
ফলে সেন্টমার্টিনে প্লাস্টিক বর্জ্যের এই নতুন প্রবাহকে কেবল পরিচ্ছন্নতার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন অর্থনীতির জন্য একটি আন্তসীমান্ত ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আন্তসীমান্ত দূষণ ঠেকাতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

দ্বীপের দূষণ কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করার পাশাপাশি সমুদ্রস্রোতে ভেসে আসা বর্জ্যের উৎস শনাক্ত করা জরুরি। কোন এলাকা থেকে এসব বর্জ্য আসছে, কোন মৌসুমে এর প্রবাহ বেশি এবং সমুদ্রস্রোতের কোন গতিপথে এসব বর্জ্য সেন্টমার্টিনে পৌঁছাচ্ছে—এসব বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারাও বলছেন, এখন আন্তসীমান্ত দূষণ মোকাবিলায় যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়ভাবে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে সৈকত থেকে বর্জ্য সরিয়ে ফেলা সম্ভব হলেও সমুদ্রে প্লাস্টিক বর্জ্যের উৎস বন্ধ করা না গেলে একই সমস্যা বারবার ফিরে আসতে পারে। তাই সেন্টমার্টিনের পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি আন্তসীমান্ত সামুদ্রিক দূষণ মোকাবিলাতেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

নইলে পর্যটন মৌসুমে লাখো মানুষের আকর্ষণের এই প্রবাল দ্বীপ একদিকে যেমন প্লাস্টিক দূষণের ভারে বিপর্যস্ত হবে, অন্যদিকে এর অনন্য জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন সম্ভাবনাও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা