সোমবার | সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশ হবিগঞ্জ শহর এখন অবৈধ টমটম ও অটোরিকশার দখলে, স্থায়ী সমাধান চায় এলাকাবাসী

হবিগঞ্জ শহর এখন অবৈধ টমটম ও অটোরিকশার দখলে, স্থায়ী সমাধান চায় এলাকাবাসী

হবিগঞ্জ থেকে লিটন পাঠান : হবিগঞ্জ শহরের যানজট এখন নিত্যদিনের ভোগান্তির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে টমটম-অটোরিকশা। শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু পেছনের রোড, বাইপাস সড়ক, যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের সারি। সাথে রয়েছে অবৈধ অটোরিকশা, অতিরিক্ত সংখ্যক টমটম ও অটোরিকশার কারণে যানজটের পাশাপাশি পথচারীদের চলাচলেও তৈরি হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। স্বল্প দূরত্বের পথ পাড়ি দিতে যেখানে ১০ মিনিট সময় লাগার কথা, সেখানে যানজটের কারণে আধা ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় লাগছে। এ অবস্থায় যানজট নিরসনে অবশেষে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে হবিগঞ্জ পৌরসভা।

জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নাম্বারপ্লেটবিহীন টমটম আটক ও জব্দের অভিযান শুরু হয়েছে। রবিবার শহরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩০টি নাম্বারপ্লেটবিহীন টমটম আটক করা হয়। এর আগে পৌরসভার পক্ষ থেকে মাইকিং করে নাম্বারপ্লেটবিহীন টমটম শহরে না চালানোর জন্য সতর্ক করা হয়েছিল। পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, অতীতে রেজিস্ট্রেশন বা লাইসেন্সবিহীন টমটম আটক করে জরিমানা ও মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হতো। এতে কিছুদিন পর আবারও একই টমটম সড়কে নামত। এবার আটক করা টমটমগুলো জব্দ করে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে মালিক বা চালকদের আগের মতো সহজে ছাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকছে না।

জানা যায়, হবিগঞ্জ শহরের যানজটের চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শহরের চৌধুরী বাজার থেকে শায়েস্তানগর পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এবং ব্যাক রোডে আরও প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক টমটম ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, শহরে বৈধ লাইসেন্সধারী টমটম রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০টি। এর বিপরীতে অবৈধ বা লাইসেন্সবিহীন টমটমের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ হাজার বলে জানিয়েছেন পৌরসভার প্রশাসক মো. মঈনুল হক, যিনি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রতিদিনই দিনের বেলার পাশাপাশি সন্ধ্যায় শহরের প্রধান সড়কে ভয়াবহ যানজট শুরু হয়। অতিরিক্ত টমটম আর অটোরিকশার চাপে যানজট ছড়িয়ে পড়ে টাউন হল পর্যন্ত। ফলে পথচারীদেরও যানবাহনের ফাঁকফোকর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, টমটমের ভাড়া কম হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে এটি জনপ্রিয়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় যেতে সাধারণত ১০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। তবে যাত্রী চাহিদার তুলনায় টমটমের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সুবিধার বদলে এখন তা দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে টমটমের সারি থাকায় যানজট তৈরি হচ্ছে দিন-রাতই।

পৌরসভা প্রশাসক মো. মঈনুল হক জানিয়েছেন, অবৈধ টমটমের কারণে শহরজুড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে লাইসেন্সধারী টমটমগুলোকে দুই রঙে ভাগ করে নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী চলাচলের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অবৈধ টমটম শহরের বাইরে অন্য সড়কে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এদিকে শুধু টমটম অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করলেই যানজট পুরোপুরি কমবে না বলে মনে করছেন শহরবাসী। শহরে সড়কের পাশের বিশেষ করে থানার মোড় থেকে কোর্ট মসজিদ এবং অন্যান্য এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করা, অবৈধ পার্কিং বন্ধ, নির্দিষ্ট স্থানে যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করাও জরুরি। পৌরসভা জানিয়েছে, ফুটপাত দখলমুক্ত করতেও পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। অতীতে দেখা গেছে ফুটপাত দখলমুক্ত করা হলেও একদিন যেতে না যেতেই আগের অবস্থায় ফিরে যায়। তাই শুধু উচ্ছেদ করলেই হবে না জরিমানাসহ মালামাল জব্দের ব্যবস্থা করতে হবে।

এ ছাড়া শহরবাসীর প্রত্যাশা, টমটম, রিকশা, কিংবা ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযান যেন এক-দুই দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। অতীতে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়ার পর একই যান আবার সড়কে নামার অভিযোগ রয়েছে। ফলে এবার আটক টমটমের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল/জব্দ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়ায় দণ্ড কার্যকর করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অবৈধ টমটমের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, জব্দকৃত যানবাহনের যথাযথ সংরক্ষণ এবং পুনরায় সড়কে নামার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।

শহরবাসী বলছেন, কয়েক দিনের কড়াকড়ি দিয়ে হবিগঞ্জের যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বৈধ ও অবৈধ টমটমের তালিকা হালনাগাদ, নির্দিষ্ট রুট ও সময় নির্ধারণ, ফুটপাত দখলমুক্তকরণ এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পৌরসভা ও প্রশাসনের চলমান উদ্যোগ নিয়মিত ও কার্যকরভাবে অব্যাহত থাকলেই কেবল হবিগঞ্জ শহরের দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার টেকসই সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা