সোমবার | অক্টোবর ১৯, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশঢাকা অপরাধের ঘটনায় আলোচনায় একাধিক স্থাপনা

সাভার-আশুলিয়ায় ২২ রিসোর্টের অনুমোদন নিয়ে অস্পষ্টতা

অপরাধের ঘটনায় আলোচনায় একাধিক স্থাপনা

সাভার থেকে, ফাহাদ-ই-আজম : সাভার ও আশুলিয়ায় একের পর এক গড়ে উঠছে রিসোর্ট, ইকো-রিসোর্ট ও অবকাশকেন্দ্র। এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, লাইসেন্স, জমি ও ভবনের অনুমোদন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, এ অঞ্চলের কয়েকটি রিসোর্ট ও আবাসিক হোটেলের নাম উঠে এসেছে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা ও পুলিশের অভিযানে। ফলে রিসোর্টগুলোর নিয়মনীতি অনুসরণ, অপরাধ প্রতিরোধ এবং সরকারি নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী,
সাভার-আশুলিয়া ও আশপাশের এলাকায় অন্তত ২২টি রিসোর্ট ও অবকাশকেন্দ্রের নাম পাওয়া গেছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন ও লাইসেন্সের বর্তমান অবস্থা, ভবন নির্মাণের অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থার সমন্বিত সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে কোন প্রতিষ্ঠান কী ধরনের অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। সরকারি অনলাইন নথিতে আশুলিয়ার কনকর্ড রিসোর্ট আটলান্টিসের নিবন্ধনের মেয়াদ ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার তথ্য দেখা গেছে। একই নথিতে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা ‘নিবন্ধিত’ হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছে। নিবন্ধন নবায়ন ও হালনাগাদ নথির তথ্য পাওয়া না যাওয়ায় বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করা প্রয়োজন।

অপরাধের ঘটনায় আলোচনায় একাধিক স্থাপনা

সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন অপরাধের তদন্ত ও পুলিশের অভিযানের ঘটনায় কয়েকটি রিসোর্ট ও আবাসিক হোটেলের নাম সংবাদমাধ্যমে এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার পরিকল্পনাসংশ্লিষ্ট একটি বৈঠক সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের গ্রিন জোন রিসোর্টে হয়েছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ওই ঘটনায় রিসোর্টের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের বিষয়টিও সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। এছাড়া ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই প্রকাশিত সংবাদে আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকার হিমালয় গেস্ট হাউসে পুলিশের অভিযানে ১৩ জন নারী-পুরুষকে আটকের তথ্য প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের রাজমহল রিসোর্টে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় পাঁচজন কর্মী আহত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ অঞ্চলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে হানি ট্র্যাপ, ব্ল্যাকমেইল ও প্রতারণার অভিযোগও স্থানীয় সূত্রে উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো কোনো চক্র ভুয়া পরিচয়ে ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট স্থান, ফ্ল্যাট বা রিসোর্টে ডেকে নিয়ে জিম্মি করা, মারধর কিংবা আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রিসোর্ট ও আবাসিক হোটেলগুলোতে অপরাধ প্রতিরোধ এবং নজরদারি কতটা কার্যকর, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

১৩ কর্মকর্তা দিয়ে নজরদারি, চলছে অভিযান: ট্যুরিস্ট পুলিশ

সাভার-আশুলিয়া ট্যুরিস্ট পুলিশ জোনের ইনচার্জ মো. হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, এলাকায় থাকা রিসোর্টগুলোর বিপরীতে তাঁদের ১৩ জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, নিয়মিত রিসোর্টগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মুঠোফোনে কথা বলার সময় তিনি জানান, তখনও তিনি হাবিব রিসোর্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করছিলেন। পর্যটনকেন্দ্রে অপরাধ প্রতিরোধ এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে, ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অফিসার ইনচার্জ সাইদুল ইসলাম জানিয়েছেন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হোটেল বা রিসোর্টে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড হলে সংশ্লিষ্ট মালিক কিংবা ব্যবস্থাপক জড়িত থাকলে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনার কথা জানান তিনি।

অনুমোদন যাচাই ও নজরদারি জোরদারের প্রয়োজন

রিসোর্টগুলোর নিবন্ধন, লাইসেন্স, ভবন নির্মাণের অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে সমন্বিত সরকারি তথ্য না থাকায় তদারকির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে না। নিয়মিত পরিদর্শন, অনুমোদনের নথি যাচাই এবং অনিয়ম শনাক্ত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

অতীতে এসব এলাকায় ঘটে যাওয়া অপরাধের ঘটনাগুলো বিবেচনায় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। রিসোর্টগুলোতে নিয়মিত অভিযান, সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের তথ্য যাচাই, সিসিটিভি ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং অপরাধের ঝুঁকি চিহ্নিত করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

তালিকায় ২২ রিসোর্ট ও অবকাশকেন্দ্র

সরেজমিনে সংগৃহীত তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— ১. কানিজ বুটিক রিসোর্ট ২. রাজমহল রিসোর্ট ৩. ছায়াবীথি রিভারভিউ রিসোর্ট ৪. লেকভিউ রিসোর্ট অ্যান্ড রিট্রিট ৫. কল্লোল রিসোর্ট ৬. সূর্য দীঘল রিসোর্ট ৭. ছায়াবীথি বুটিক রিসোর্ট ৮. রিসোর্ট ১৯ এপ্রিল ৯. কনকর্ড রিসোর্ট আটলান্টিস ১০. বর্ণছটা রিসোর্ট ১১. মমতা পল্লী রিসোর্ট ১২. স্যাফায়ার হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ১৩. আর্ক ক্যাসেল রিসোর্ট ১৪. জলছায়া ইকো রিসোর্ট ১৫. গল্পনীড় ১৬. ইডেন গার্ডেন রিসোর্ট ১৭. পালমিরা রিসোর্ট ১৮. পার্ক সিটি রিসোর্ট ১৯. বিআরএসি-সিডিএম সাভার ২০. দ্য সানরাইজ ভিলা অ্যান্ড রিসোর্ট ন২১. আলাদিনস রিসোর্ট অ্যান্ড ওয়াটার পার্ক ২২. হাবিব রিসোর্ট তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই, নিয়মিত সরকারি পরিদর্শন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তৎপরতা ও জবাবদিহি প্রয়োজন।

রিসোর্টগুলোর মালিকপক্ষের বক্তব্য
প্রতিবেদনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট রিসোর্টগুলোর মালিকপক্ষের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে ফোনে যোগাযোগ করেও তাঁদের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে রিসোর্টগুলোর নিবন্ধন, অনুমোদন, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে মালিকপক্ষের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, রিসোর্টে দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, তাঁরা মালিকপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেন। রিসোর্টের অনুমোদন ও নিবন্ধনসংক্রান্ত বিষয়ে তাঁদের বিস্তারিত জানা নেই বলেও জানান তাঁরা।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা