ওমর ফারুক : সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (UNGA) বর্তমান সভাপতি ড. খলিলুর রহমান বিশ্বমঞ্চে এক ঐতিহাসিক ও জোরালো বক্তব্য পেশ করেছেন। তিনি দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্য থেকে স্থায়ী সদস্যপদ প্রদানের জোরালো দাবি জানান। তার এই দূরদর্শী ও ন্যায়সংগত প্রস্তাবের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
১. জাতিসংঘে ড. খলিলুর রহমানের মূল বক্তব্য
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ড. খলিলুর রহমান নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত বৈষম্য তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, আফ্রিকার দেশগুলো জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক সদস্যগোষ্ঠী এবং বিশ্বজুড়ে শান্তি রক্ষা কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও নিরাপত্তা পরিষদে তাদের কোনো স্থায়ী আসন নেই। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আফ্রিকাকে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা কোনো করুণা নয়, বরং এটি তাদের অধিকার।” তার এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে এবং এটি আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হচ্ছে।
২. ভারতের ‘স্থায়ী সদস্যপদ’ এবং বৈশ্বিক স্বপ্নভঙ্গ প্রসঙ্গের বাস্তবতা
বিগত চার দশক (৪০ বছর) ধরে ভারত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ষষ্ঠ স্থায়ী সদস্য হওয়ার জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। এই স্বপ্নপূরণের পথে তারা অনেক দূর এগিয়েও গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ইউটিউব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই এক চালে ভারতের সেই প্রচেষ্টা বড় ধাক্কা খেয়েছে।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর পেছনের প্রকৃত কারণসমূহ:
আফ্রিকাকে অগ্রাধিকার: ড. খলিলুর রহমান সরাসরি ভারতের বিরোধিতা না করলেও তিনি এমন একটি অঞ্চলের (আফ্রিকা মহাদেশ) জন্য স্থায়ী আসনের দাবি তুলেছেন, যা দীর্ঘকাল ধরে উপেক্ষিত। ফলে আন্তর্জাতিক মনোযোগ এখন ভারতের চেয়ে আফ্রিকার অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার দিকে বেশি ধাবিত হচ্ছে।
নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের নতুন মোড়: নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক চলছে। যখনই কোনো নতুন দেশের (যেমন ভারত, জাপান বা জার্মানি) নাম আসে, তখনই পুরো পরিষদের সংস্কারের প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। বাংলাদেশ কর্তৃক আফ্রিকার স্থায়ী আসনের জোরালো দাবি এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে একটি নতুন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপ দিয়েছে, যা একক কোনো দেশের একক আধিপত্যের পথকে কিছুটা জটিল করে তুলেছে।
৩. জাতিসংঘ মহাসচিবের সমর্থন ও সংহতি
প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্যানুযায়ী, ড. খলিলুর রহমানের এই সুরের সাথে স্বয়ং জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও সহমত পোষণ করেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব নিজেও অতীতে বহুবার বলেছেন যে, নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামোটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আমলের এবং এটি আধুনিক পৃথিবীর বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না। বিশেষ করে আফ্রিকা মহাদেশের কোনো স্থায়ী প্রতিনিধি না থাকাটা একটি বড় ঐতিহাসিক অন্যায়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই প্রস্তাবের পর মহাসচিবের পক্ষ থেকে সংস্কারের এই তাগিদ আরও গতি পেয়েছে।
