নীলফামারী থেকে এন.এম হামিদী বাবু : নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে মাঠজুড়ে পাকা ধানের সমারোহ। কোথাও কাস্তের কোপে ধান কাটার শব্দ, কোথাও চলছে মাড়াইয়ের ব্যস্ততা। কেউ ধান কেটে আঁটি বাঁধছেন, কেউ মাড়াই করে ফসল ঘরে তুলছেন। ভালো ফলন হওয়ায় মাঠে কৃষকের কর্মচাঞ্চল্য থাকলেও মুখে নেই স্বস্তির হাসি। কারণ উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের বাজারদর কম থাকায় ভালো ফলন পেয়েও লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন এ অঞ্চলের আগাম আমন চাষিরা।
কৃষকদের দাবি, সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক, ধান কাটা ও মাড়াইসহ বেড়েছে উৎপাদন খরচ। বর্তমানে প্রতি বিঘা জমিতে আগাম আমন চাষে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। অথচ স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে। ফলে ধানের বর্তমান বাজারদরে উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না অনেক কৃষক। এতে বিঘাপ্রতি ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা।
গত এক সপ্তাহ ধরে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠে চলছে আগাম আমন ধান কাটা ও মাড়াই। কৃষক, শ্রমিক ও কৃষাণিদের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠেছে ফসলের মাঠ। কেউ কাস্তে দিয়ে ধান কাটছেন, কেউ জমিতে প্লাস্টিকের নেট বিছিয়ে মাড়াই করছেন। আবার কেউ কম্বাইন হারভেস্টারের মাধ্যমে দ্রুত ধান কেটে ও মাড়াই করে ফসল ঘরে তুলছেন।
কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ৪ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে আগাম আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলা ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি থেকে আশ্বিনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অধিকাংশ জমির ধান কাটা ও মাড়াই করা হবে।
পুটিমারি ইউনিয়নের কৃষক নুর মোহাম্মদ সোনা বলেন, “এবার ১৩ বিঘা জমিতে আগাম আমন ধান চাষ করেছি। আমন ধান ঘরে তুলে আগাম আলু রোপণের পরিকল্পনা করছি। প্রতি বিঘায় ধান চাষে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলন পেয়েছি ১৭ মণ। প্রতি বিঘা ৫২০ টাকা দরে ধান বিক্রি করলে পাওয়া যায় ৯ হাজার ৩৬০ টাকা। খড় বিক্রি করে কিছু বাড়তি আয় হলেও সব মিলিয়ে ১৩ বিঘা জমিতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।”
নিতাই ইউনিয়নের কৃষক মজিবুর রহমান জানান, আগাম আমন ধান দ্রুত ঘরে তুলে পরবর্তী মৌসুমে আগাম আলু চাষ শুরু করার লক্ষ্যেই তারা এ জাতের ধান চাষ করেন। কিন্তু এবার ফলন ভালো হলেও ধানের বাজারদর উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে ধান চাষে লোকসানের পাশাপাশি পরবর্তী ফসলের জন্য নতুন করে বিনিয়োগের চাপ তৈরি হয়েছে।
কচুকাটা এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ না ওঠায় পরবর্তী ফসল আলু চাষের জন্য তাদের নতুন করে ঋণ করতে হতে পারে। এতে একদিকে আগাম আমনে লোকসান, অন্যদিকে আগাম আলু চাষে বাড়তি বিনিয়োগ—দুই দিক থেকেই চাপে পড়ছেন তারা।
কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কৃষক ফললুল হক বলেন, “এবার ৭ বিঘা জমিতে আগাম আমন ধান চাষ করেছি। বিঘাপ্রতি ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলন হয়েছে ১৮ মণ। বর্তমান বাজারদরে ধান বিক্রি করে লোকসান হচ্ছে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলম বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৪ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে আগাম আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরই মধ্যে অধিকাংশ জমির ধান কাটা ও মাড়াই শেষ হয়েছে। এ অঞ্চলে প্রতিবছর আগাম আমন ও আগাম আলু চাষ হয়। আমন ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কয়েক দিন পরই কৃষকেরা আগাম আলু রোপণ শুরু করবেন।
তিনি আরও বলেন, ১১০ দিনে উৎপাদনযোগ্য, জলবায়ু সহনশীল ও উচ্চফলনশীল ব্রি ধান-৯৪ জাতের আগাম আমন চাষে ৬৫০ জন কৃষককে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের মাঠপর্যায়ে সার্বিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
