বুধবার | সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
প্রচ্ছদ সারাদেশঢাকা আশুলিয়ায় প্রীতি গ্রুপে বিস্ফোরণ: পাঁচ মরদেহের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষায়

আশুলিয়ায় প্রীতি গ্রুপে বিস্ফোরণ: পাঁচ মরদেহের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষায়

আশুলিয়া থেকে জাহাঙ্গীর আলম রাজু : আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় প্রীতি গ্রুপের পোশাক কারখানার নির্ধারিত পার্কিংয়ে বিস্ফোরণে পুড়ে যাওয়া কাভার্ড ভ্যান থেকে উদ্ধার হওয়া পাঁচ মরদেহের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরিচয় শনাক্তে মরদেহগুলোর নমুনা এবং নিখোঁজ দাবি করা পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও আশুলিয়া থানার পরিদর্শক হারুন-অর-রশিদ।

তিনি বলেন, মরদেহ পাঁচটি অতিরিক্ত পুড়ে যাওয়ায় সাধারণভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। পাঁচটি মরদেহের নমুনার পাশাপাশি নিখোঁজ দাবি করা পাঁচ পরিবারের নয় সদস্যের ডিএনএ নমুনা সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সিআইডির ফরেনসিক বিভাগকে অনুরোধ করা হয়েছে। এদিকে বিস্ফোরণের পর থেকে মুগদা থানার উত্তর মান্ডা এলাকার বাসিন্দা মো. সাইফুল কাজী তার ছেলে ইমতিয়াজ কাজী (১৮) নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করেছেন।

সাইফুল কাজী জানান,ভোলা থেকে গ্যাস সিলিন্ডারবোঝাই কাভার্ড ভ্যান নিয়ে আশুলিয়ায় আসেন তার ছেলে ইমতিয়াজ। তিনি ওই কাভার্ড ভ্যানের চালকের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। কাভার্ড ভ্যানটি চালাতেন তার শ্যালিকার ছেলে নুরুল ইসলাম। বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুরুল ইসলাম মারা যান। তবে ঘটনার পর থেকে ইমতিয়াজের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, পাঁচ মরদেহের মধ্যে তার ছেলের মরদেহ থাকতে পারে বলে পুলিশ ধারণা করার পর আশুলিয়া থানা পুলিশের সহযোগিতায় গতকাল তার ডিএনএ নমুনা সিআইডিতে দেওয়া হয়েছে। দ্রুত ডিএনএ প্রতিবেদন পাওয়ার দাবি জানান তিনি। ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে কতদিন সময় লাগতে পারে জানতে চাইলে সিআইডির মিডিয়া উইংয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, নমুনাগুলো তারা পেয়েছেন। প্রতিবেদন পেতে প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে। কারণ, পাওয়া নমুনাগুলো হার্ড টিস্যু। সফট টিস্যু হলে তুলনামূলক কম সময়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হতো।

গত ২০ সেপ্টেম্বর প্রীতি গ্রুপের কারখানার পার্কিংয়ে থাকা একটি লরিতে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। এতে এখন পর্যন্ত আটজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। বিস্ফোরণে উড়ে যাওয়া সিএনজি গ্যাস সিলিন্ডারের আঘাতে ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা দূরে একটি দোকানে বসে থাকা জয়নব বেগম (৫৫) এবং সবজি বিক্রেতা নজরুল ইসলাম (৩২) নিহত হন। এছাড়া দগ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কাভার্ড ভ্যানের চালক নুরুল ইসলাম (৩০) মারা যান।

এই তিনজনের পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা করা হয়নি। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনায় একটি মামলা করা হয়েছে।ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম উল্লেখ করে মামলা

মামলায় দাহ্য পদার্থ অপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় প্রতিষ্ঠানটির ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিরা হলেন-কারখানাটির জিএম মো. সোহেল রানা, এজিএম মো. মহিউদ্দিন, ম্যানেজার মো. মোজাম্মেল হোসেন, কারখানার প্রকৌশলী মো. রাজীব হোসেন, হেলপার মো. আল আমীন ও মো. এনামুল। তবে মামলায় প্রকৃত দায়ীদের নাম না থাকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শ্রমিক নেতারা।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে মূলত ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকেন। প্রতিষ্ঠানে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকও দায় এড়াতে পারেন না। অথচ মামলায় প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাউকে আসামি করা হয়নি; শুধু কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আসামি করা হয়েছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানটি অবৈধভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ সিএনজি সিলিন্ডারে গ্যাস মজুত করছিল বলে তারা জানতে পেরেছেন। এ কারণেই বিস্ফোরণ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহকারী সিএনজি স্টেশনের মালিক এবং গ্যাস পরিবহন ও মজুতের বিষয়টি তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

শ্রমিক নেতা খাইরুল মামুন মিন্টুর অভিযোগ, মামলার তদন্তে এক ধরনের অবহেলা দেখা যাচ্ছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন,মামলায় প্রাথমিক ভাবে যাদের দায়ী মনে হয়েছে, তাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে যাদের অপরাধ ও দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হবে, তাদের নাম মামলায় সংযুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। অপরাধীরা ছাড় পাবে না। মামলায় এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে কি না জানতে চাইলে ওসি বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। চার কারখানা বন্ধ বিস্ফোরণের ঘটনার পর থেকে প্রীতি গ্রুপের চারটি কারখানা বন্ধ রয়েছে।

আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূইয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,
বুধবারও প্রীতি গ্রুপের চারটি কারখানা বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন প্রতিষ্ঠানটির সামনে বিভিন্ন দাবিতে কর্মসূচি পালন করছে। ঘটনার তদন্ত, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত এবং বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

সোস্যাল মিডিয়াতে দৈনিক জনতা